বিএনপির পুনর্গঠনে বাড়ছে কোন্দল

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: পুনর্গঠন নিয়ে হযবরল অবস্থা বিএনপিতে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কোনো মতামত না নিয়ে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া কমিটিতে বাড়ছে দ্বন্দ্ব-কোন্দল। অনেকে রাগে-ক্ষোভে ও অভিমানে দলের কার্যক্রম থেকে নিষ্ফ্ক্রিয় হচ্ছেন। কেউ কেউ পদত্যাগও করছেন। অনেকে কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ দিয়ে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেক জেলা কমিটিতে অনাস্থা জানিয়ে বিদ্রোহ করছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা।

অবশ্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় এবং দলের দুর্দিনে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মী। ক্ষোভকে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে নিতে চাইছেন না। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন কিংবা খালেদা জিয়ার মুক্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছেন তারা। বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা জানান, কমিটি গঠনে কোনো সিনিয়র-জুনিয়র মানা হয়নি। অনেক জায়গায় ভাগবাটোয়ারার কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব কমিটির অনেক নেতাকে তৃণমূল নেতারা তেমন চেনেন না। জেলার নতুন কমিটি গঠনে সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের বেশিরভাগ নেতাই তাদের নিজেদের মতো করে কমিটি করছেন। অতীতে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামত নিয়ে জেলা কমিটি করা হতো। কিন্তু এবার অনেক ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটছে বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ। কোনো কোনো জেলায় গঠিত আহ্বায়ক কমিটির নেতারা থানা, পৌর ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনে ত্যাগী আর যোগ্যদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।

এদিকে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া জেলা কমিটি গঠনেও একেক জেলায় একেক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এসব কমিটিকে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো জেলায় শর্ত দেওয়া হয়েছে, কমিটির আহ্বায়ক কাউন্সিলে অংশ নিতে পারবেন না। আবার কোনো কোনো জেলায় শর্ত দেওয়া হয়েছে, আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব কেউই কাউন্সিলে অংশ নিতে পারবেন না। এসব শর্তের বেড়াজালে অনেক জেলার প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে নামকাওয়াস্তে কমিটি দিয়েছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটির মধ্যে অধিকাংশ কমিটি ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটি গঠনের কাজ চলছে। সেখানে দ্রুতই নতুন কমিটি করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দু-একটি অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে যেসব জেলার কমিটি হয়েছে, সেখানে দলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।

মে মাসে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষোভ দেখা দেয়। ওই সময় বিএনপির পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা শহরের নবাববাড়ি সড়কে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং দলীয় কার্যালয়ের সামনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ১৪ নেতাকর্মীকে বহিস্কার করায় কার্যালয়ে একে একে ১৪টি তালা ঝুলিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। পরে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের সময় ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমিত হলেও অদৃশ্য কোন্দল রয়েই গেছে। বগুড়া আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক জি এম সিরাজ ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্কারপন্থি নেতা ছিলেন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা আগে থেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিজের জেলা ফেনী বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। জেলার ক্ষুব্ধ কয়েক নেতা জানান, আন্দোলন-সংগ্রামকারী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের পছন্দের নিষ্ফ্ক্রিয় নেতাদের দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছেন। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। দলের চেইন অব কমান্ড রক্ষায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।

গত জুলাই মাসে পাবনা জেলা কমিটিতে সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে সদস্য সচিব করা হয়েছে। তিনি কমিটির একজন জুনিয়র নেতা। এর আগে ছাত্রদলের জেলা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আহ্বায়ক কমিটির একজন নেতা জানান, সিদ্দিক অনেক জুনিয়র। তার রাজনীতির কেবল শুরু। এ বয়সে তাকে সদস্য সচিব করার মাধ্যমে তার রাজনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কারণ বিধান অনুযায়ী আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে পারবেন না।

গত জুন মাসে গঠিত মাদারীপুর জেলা কমিটি কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জেলার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করছেন। জেলা আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের জন্যও আবেদন জানানো হয়েছে কেন্দ্রের কাছে। জেলার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহান বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলার স্থানীয় নেতাদের দিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। জেলার ৪৩ সদস্যের বেশিরভাগ মাঠের নেতা নন।

নেতাকর্মীরা জানান, কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতাদের দিয়ে জেলার মাঠে কর্মসূচি পালন করা সম্ভব নয়। এসব কারণে জেলার উপজেলা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। কাদা ছোড়াছুড়ির এক পর্যায়ে জেলার একটি অংশ সংগঠনের সদস্য সচিবের বহিস্কারাদেশ চেয়ে তারেক রহমানের কাছে আবেদন করেছে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

বিতর্কিতদের দিয়ে সিলেট জেলা আহ্বায়ক কমিটি করায় তৃণমূলে ক্ষোভ-অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে।

নেতাকর্মীরা জানান, জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা সভাপতি কামরুল হুদা জায়গীরদারকে করা হয়েছে সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। অথচ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাড়ি ছাড়তে উচ্চ আদালতে রায় দিয়েছিলেন তার ভাই। এ কারণে কামরুল হুদা জায়গীরদারকে নিয়েই নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশি অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আবার পকেট কমিটি গঠনের জন্য জেলার ১৭টি ইউনিটের মধ্যে কোনোটির সাধারণ সম্পাদককে রাখা হলেও সভাপতিকে রাখা হয়নি।

অনেক ক্ষেত্রে থানা কমিটির সদস্যকে জেলা কমিটিতে রাখা হলেও থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠন নিয়েও অসন্তোষ বিরাজ করছে জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে গত রোববার সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, কেন্দ্রীয় সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক সামসুজ্জামান এবং কেন্দ্রীয় সদস্য শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে লিখিত অভিযোগ করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

নাটোর জেলার আহ্বায়ক কমিটিতে সবচেয়ে সিনিয়র রাজনীতিবিদ গোলাম মোস্তফা নয়নকে রাখা হয়েছে সর্বশেষ সদস্য হিসেবে। অথচ তার রাজনীতির শুরু জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাগদলের নাটোরের বাগাতিপাড়া থানার সভাপতি হিসেবে। অনেকটা অভিমান করে পুরো রাজনীতি থেকেই ইস্তফা দিয়ে কানাডা চলে গেছেন তিনি।

একইভাবে গোপালগঞ্জ জেলা কমিটি ঘোষণার পরই নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ চলছে। ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এনে যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান পিনু পদত্যাগ করেন। এভাবে নেত্রকোনা জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পরপরই বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করে কমিটির বিরোধিতা করেন। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লেনদেনেরও অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আপসরফা হয়। তবে এখনও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের দাবি মানা হয়নি। এতে যে কোনো সময় প্রকাশ্য কোন্দল শুরু হতে পারে।

জেলা কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম সফিকুল কাদের সুজা বলেন, তারেক রহমানের নির্দেশনার বাইরে তৃণমূলকে বাদ দিয়ে ঢাকা থেকে কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এ ছাড়া বিগত কমিটির সদস্যও ছিলেন। কমিটি গঠনের কোনো শর্তই মানা হয়নি।

অন্যদিকে কোন্দলের কারণে বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, লক্ষ্মীপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলার কমিটি গঠন করতে পারছে না কেন্দ্রীয় বিএনপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *