পিসি রায়ের জন্মঘরে মাকড়সার জাল-মাদকের আড্ডা! (ভিডিও)

Spread the love

রাড়ুলী (পাইকগাছা, খুলনা) ঘুরে: রঙচটা পাকা দোতলা ভবনটার দশা একেবারে ভঙ্গুর। প্রাচীর তো ভেঙেছেই, ভেঙে পড়েছে ভবনটার ওপর এবং নিচতলার পেছনের দেওয়ালও, সেজন্য পেছনের অংশ দিয়েই ভবনে ঢোকা যায় অনায়াসে। দরজা-জানালার কাঠও টোকা দিলে যেন পড়ে যায়।

নিচতলার দুই কক্ষের একটিতে ঢুকে দেখা গেলো মাদকাসক্তদের আড্ডার আলামত, নাকে এলো গন্ধও। আরেকটি কক্ষে ভাঙাচোরা ইট, কাঠ আর মরচেপড়া লোহার দরজা-জানালার ভগ্নাংশ, কোথাও কোথাও মাকড়সাও জাল পেতেছে। এ দুই কক্ষেই ঘোরার সময় সতর্কতা কানে বাজছিল, ‘ওপরের ছাদ বিপজ্জনক, দ্রুত বেরিয়ে আসেন’। সে কারণে আর ইচ্ছে থাকলেও দোতলায় ওঠা গেলো না।

ঘুরে ঘুরে ভবনটাকে কয়েকবার দেখার পর সামনের আঙিনায় এসে অপেক্ষা কিছুক্ষণ। কে বলবে, এই ভবনেই জন্মেছিলেন বিশ্ব বরেণ্য বাঙালি বিজ্ঞানী রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (পিসি রায়)। কে বলবে, ওই যে ভাঙচোরা ইট-কাঠ-দরজা-জানালা পড়ে আছে, সেই কক্ষটাতেই প্রথম চোখ খুলে হেসেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধিপ্রাপ্ত বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা মার্কিউরাস নাইট্রাইটের আবিষ্কারক!

খুলনার পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদের তীরে ছায়া সুনিবিড় সবুজে ঘেরা রাড়ুলী গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশকে আরও নিস্তব্ধ করে রেখেছে যেন পিসি রায়ের ভঙ্গুর জন্মঘরটা। গুণীর জন্মভিটার কী কদর!

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮৫০ সালে প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা জমিদার হরিশচন্দ্র রায় রাড়ুলী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। দুইভাগে বিভক্ত করে বানানো বাড়ির একটি হলো সদর মহল, আরেকটি অন্দর মহল। প্রায় ভেঙে পড়া এই দোতলা ভবনটাই অন্দর মহল। এটা বাড়ির নারীদের বসবাসের জন্য বানানো। আর সদর মহল গ্রামের প্রধান সড়কঘেঁষে। এই মহলেরই পেছনের অংশে বানানো অন্দর মহল।

দক্ষিণমুখী মূল বাড়িতে ঢুকলেও প্রথমে চোখ পড়লো পুবদিকের শানবাঁধানো প্রাচীন পুকুরটি পেরিয়ে অন্দর মহলেই। এই ভঙ্গুর ভবনটা বানানো মূল সদর মহলেরই মতো মুসলিম ও ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে। এর প্রথম তলার বারান্দায় খিলান ও দ্বিতীয় তলার বারান্দায় গোলাকার জোড়াখুঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্দর মহলের পেছনটায় এখন সাব-পোস্ট অফিস।

অন্দর মহলের সামনে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে হাতের বাঁয়ে তারকাঁটার বেড়ার দরজা ঠেলে সদর মহলের মূল দরজা। সাড়ে ৬ হাত লম্বা শক্ত কাঠের এ দরজা ঠেলতেই মূল জমিদার বাড়ি। বড় উঠোনে দাঁড়ালে হাতের বাঁদিকে দোতলা বাড়ি, নাক বরাবর সামনে ঠাকুর ঘর, ডানপাশে ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির একতলা ভবন, যেটা দরজার জায়গা রেখে আবার পেছনের দিক দিয়ে দোতলা ভবনের সঙ্গে গিয়ে মিলেছে। দোতলা ভবনটার ঠাকুর ঘর সংলগ্ন অংশে বেশ খানিকটা ভেঙে গেছে। বিশাল অংশের ছাল-চামড়াও গেছে উঠে। হাতের ডান দিকে যে একতলা ভবনটা সেটার সামনেই পুরো বাড়ির আঙিনা। বাড়ির সামনে রঙিন পাথরে খচিত পিসি রায়ের প্রতিমূর্তি। আর দরজার দু’দিকে বাড়িটি নির্মাণ ও সংস্কার সংক্রান্ত তথ্যাদি লেখা দু’টি ফলক।

মূল ভবনের ছাদের ওপর একটি সিংহমূর্তি। প্রায় ১৭০টি স্তম্ভের ওপর বসানো পুরো কমপ্লেক্সটিতে মোট ৪৫টি দরজা ও ১৩০টি জানালা। নকশা করা স্তম্ভ আর দেয়ালে দেয়ালে ফুল ও লতা-পাতার বাহারি সব কারুকাজ।

১৮৬১ সালের ২ আগস্ট জন্ম নেওয়া চিরকুমার প্রফুল্লচন্দ্র তার মৃত্যুর আগে জীবনের অর্জিত সব সম্পত্তি মানবকল্যাণে দান করে যান। ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন তার জীবনাবসান হলে বাড়িটি কয়েক দফায় পরিত্যক্ত ও উদ্ধার হয়। প্রফুল্লচন্দ্রের ৫ ভাই ও ভাতিজারা সব ভারতে থাকেন বলে স্বজনদের পক্ষ থেকেও এই বাড়ির খোঁজ রাখছিলেন না কেউ। তবে সবশেষে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের কাছ থেকে ১৯৯৫ সালে এ বাড়ি উদ্ধারের পর পুরাকীর্তি ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর।

ভঙ্গুর অন্দর মহলটার খোঁজ কেউ না নিলেও পৌনে ৪ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে ওঠা মূল বাড়িটাকে পুরাকীর্তি ঘোষণার মাধ্যমে সংরক্ষণ করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। যদিও জমিদার বাড়িটার সীমানা সবমিলিয়ে ২১ বিঘা।

পুরাকীর্তি ঘোষিত অংশের ‘সাইট পরিচারক’ হিসেবে কাজ করছেন তপন চন্দ্র দত্ত। ৮ বছর ধরে পুরো বাড়িটা একলা দেখভাল করছেন তিনি। থাকেন মূল বাড়ির ভেতরের একটি কক্ষেই।

তার সঙ্গে আলাপে বোঝা গেল, বাড়িটা কেবল পুরাকীর্তি ‘ঘোষণা’ আর প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মদিনকে ঘিরে ‘প্রফুল্লমেলা’ কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি যেভাবে পর্যটন স্পট হয়ে গেছে, এই বাড়িটা এখনও সেভাবে গড়ে তোলা হয়নি। প্রতিবছর ২ আগস্ট এ আচার্যের জন্মদিন উপলক্ষে ‘প্রফুল্লমেলা’ হলে এখানে ঢাকা বা বাইরে থেকে যে অতিথিরা আসেন, তারা ‘বড় সংস্কার’র কথা বলেন, কিন্তু এখনও সেভাবেই রয়ে গেছে।

আর অন্দর মহলটা ছিল এক প্রভাবশালীর দখলে। তিনি সেটার ভোগদখল করলে কয়েকবার উদ্ধার হয়, বিষয়টি আদালতেও গড়ায়। ওই প্রভাবশালীর ভোগদখলের সময়ই অন্দর মহলের ভেতরে কথিত ‘গুপ্তধনের’ সন্ধানে খোঁড়াখুঁড়ি হয়, ভাঙা হয় দেয়াল-প্রাচীর। তারপর থেকে ওই মহলটার দিকে নজর দেওয়া হয়নি। সেই সুযোগে এখানে বখাটেরা মাদকের আড্ডা বসায়। বসায় জুয়ারও আসর। সন্ধ্যার আগে-পরে জমে ওঠে সে আড্ডা। এখন ‘বড় সংস্কারের’ সময় ওই অংশটার দিকে নজর দেওয়া হবে কিনা তা বলছে না কেউ।

তপন চন্দ্র বলেন, ১৯৯৫ সালের আগে যারা এ বাড়ি ভোগদখল করেছে তারা এখানে-ওখানে ভেঙে খোঁড়াখুড়ি করে অন্দর মহল, সদর মহল সব নষ্ট করে দিয়েছে। মাঝে তারা ফের ভোগ দখলের সুযোগ পেয়ে এই বাড়িকে আরও ভেঙে-চুরে দিয়ে গেছে। এখন সদর মহল সরকারের আওতায় থাকলেও অন্দর মহলটা ভাঙাচোরাই থেকে সাইট পরিচারক মনে করেন, পুরো বাড়িটার দেখভালে জনবল আরও দরকার। অন্দর মহলটাও পুরাকীর্তির মধ্যে আনা দরকার। এই যে এখন বাড়িটা পুরাকীর্তি হিসেবে মানুষ আসতে-দেখতে পারছে তার কৃতিত্ব রাড়ুলী গ্রামবাসীকেই দেন তিনি। বলেন, অনেকবার এখানকার মানুষই ভোগদখলকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

সেই গ্রামবাসীদের একজন লুৎফর রহমান। প্রফুল্লের বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখার সময় তিনি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। লুৎফর বলেন, এই বাড়িটা আমাদের গর্ব, আমাদের সম্পত্তি। এটা যেন আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখতে পারে সরকারকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এই বাড়িটা থাকলেই তো আমাদের প্রজন্ম জানতে পারবে যে, এই অবহেলিত ও অনুনন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার রাড়ুলী গ্রামে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

যেভাবে যাবেন খুলনা থেকে বাসে পাইকগাছা যাবার পথে নামতে হবে রাড়ুলী-পাইকগাছা সংযোগ সড়কে। সেখান থেকে রিকশা কিংবা অটোরিকশায় রাড়ুলী গ্রাম। খুলনার গল্লামারী ব্রিজের মোড় থেকে সরাসরি মোটরসাইকেলও ভাড়া করা যায় প্রফুল্লচন্দ্রের বাড়ি ঘুরে আসতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *