19.6 C
New York
Friday, October 22, 2021

Buy now

spot_img

শাস্তি বাড়লেও কমেনি ধর্ষণ, নারী নির্যাতন

অনলাইন ডেস্ক: দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পরও ভয়ংকর এই অপরাধ কমছে না। বরং আরও বাড়ছে। কঠোর শাস্তির বিধানেও ধর্ষক ভীত হচ্ছে না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলাগুলোর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় সাত ভাগেরও কম মামলা। আর সাজা পায় স্বল্প সংখ্যক আসামি। আইনের ত্রুটি, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ, অর্থের দাপট এবং সামাজিক কারণে এ রকম হচ্ছে বলে মনে করছে ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়া মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া এক তরুণীকে তুলে নিয়ে গত বছর ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আরেক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সারাদেশে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে ২০২০ সালের অক্টোবরে মন্ত্রিসভায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।
একই বছরের ১৩ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশের পরদিন সেটা কার্যকরও হয়েছে। আগের আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ। আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয় ‘মৃত্যুদ বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ ‘।
আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট (উই ক্যান) সূত্রে জানা যায়, সাজার বিধান মৃত্যুদণ্ড বাড়ানোর পর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনায় ১৬১টি মামলা ও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ১৬০টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার কোনোটাতেই রায় হয়নি। ছয়টি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ তথ্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস, অর্থাৎ আট মাসে ৯৮৪ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই সময়কালে নারী নির্যাতনের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। সাজার বিধান মৃত্যুদণ্ড বাড়ানোর মাস অক্টোবরে দেশে ৩৭৪টি ধর্ষণের ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়। যা এর আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি। যদিও ধর্ষণের ঘটনা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৩ অক্টোবর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ রেখে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে অধ্যাদেশ জারির পরের মাসগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ধর্ষণ কমেনি বরং বেড়েই চলছে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৮৭ জন নারী ও কন্যাশিশু।
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ করার পরও কেন এই ঘৃণিত অপরাধ কমছে না- জানতে চাইলে আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান সমন্বয়কারী জিনাত আরা হক সমকালকে বলেন, ‘সবকিছু আইনের ভয় দেখিয়ে হয় না। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।’
বেসরকারি সংস্থা জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি বলেন, বাংলাদেশে অনেক আইনে মৃত্যুদ আছে। কিন্তু ওই সব অপরাধে কতজনকে মৃত্যুদ দেওয়া হয়েছে? একটি বা দুটি ঘটনায় আদালত অপরাধীকে মৃত্যুদ দিলেও বাস্তবে দেখা যায় আসামি পলাতক রয়েছে। ধর্ষণ মামলার আসামির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া অপরাধী জানে, অপরাধ করে সে পার পেয়ে যাবে। তার এই আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির অন্যতম কারণ ক্ষমতার প্রভাব।
মৃত্যুদণ্ডের বিধানের পর ধর্ষণ কমেছে না বেড়েছে- এমন তুলনামূলক বিশ্নেষণে দেখা যায়, ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। এদিকে মহামারি করোনার কারণে দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ। তাই অনেক ধর্ষণ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। ফলে কিছু মামলার অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হলেও তা এখনও বিচারাধীন। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সংশোধিত আইনের ফলাফল পেতে সময় লাগবে।
নারী-শিশু ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ-নির্যাতনের কারণ হিসেবে ক্ষমতা প্রদর্শনের নেতিবাচক মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাব দায়ী। শুধু বিধান করেই নয়, দ্রুততম সময়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে হবে।
দেশে এখনও গড়ে প্রতিদিন চার-পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু শাস্তির হার মাত্র শতকরা তিন ভাগ। এখনও সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ হয়নি। তবে যাবজ্জীবনের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড বিধানের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে ধর্ষণের অভিযোগে আগের আইনে করা মামলার কয়েকটি রায় হয়েছে।
কেস স্টাডি এক :নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় এক নারীকে ধর্ষণ ও বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার মামলায় দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ দেন আদালত। একই সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদ দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত এই দু’জন হলো- দেলোয়ার হোসেন ও মোহাম্মদ আলী ওরফে আবুল কালাম। নোয়াখালীর ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়নাল আবদীন ৪ অক্টোবর এ রায় ঘোষণা করেন।
কেস স্টাডি দুই :জয়পুরহাটে প্রথম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায়ে এক আসামিকে ৬০ বছরের কারাদ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে তিন লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদ দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক রুস্তম আলী এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৭ জুলাই সকালে আসামি প্রতিবেশী দুই শিশুকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। তাদের কান্নার শব্দে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে আসামি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। গ্রামবাসী তাকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। ওই ঘটনায় দুই শিশুর বাবা বাদী হয়ে পাঁঁচবিবি থানায় মামলা করেন।
কেস স্টাডি তিন :রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ মামলায় একমাত্র আসামি মজনুকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ দেন আদালত। এ ছাড়া ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সাজা দেওয়া হয়। ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম কামরুন্নাহার গত বছর ১১ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর সাজার পরোয়ানা দিয়ে আসামি মজনুকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বাদীপক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী আবদুর রশীদ বলেন, যেহেতু আগের আইনে অভিযোগ গঠন হয়েছে, ফলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর কুর্মিটোলায় নির্জন সড়কের পাশে ওই শিক্ষার্থীকে জাপটে ধরে জোর করে ধর্ষণ করে মজনু। এ ঘটনায় ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
কেস স্টাডি চার :রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় সাত বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণের দায়ে শিশুর বাবাকে যাবজ্জীবন কারাদ দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদ, অনাদায়ে আরও ছয় মাস কারাদ দেওয়া হয়। ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামছুন্নাহার গত ৭ ফেব্রুয়ারি আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের ৩ মে হাজারীবাগ থানায় শিশুর বাবার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন তার মা।
যে কারণে মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে না :ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের মুখে গত বছর অক্টোবর মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারা সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। আইন সংশোধনের এক বছর পরেও কোন ধর্ষণ মামলার রায়ে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড আসছে না।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই মামলায় ২০০০ সালের নারী নির্যাতন দমন আইনে (সংশোধন ২০০৩) কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হলে ওই আইনের ৯(১) ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ। তাই ওই আসামিকে মৃত্যুদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক মনে করেন, সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। ধর্ষণের শাস্তির পরিমাণ কমানো হলে বেশিরভাগ অপরাধী শাস্তি পাবে বলেও মনে করেন তিনি। কঠোর শাস্তির বিধান অপরাধ কমায়- এমন ধারণার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই বলে জানান শাহ্‌দীন মালিক।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, নুসরাত ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত রায় দেখেছি, যা প্রশংসনীয়। সব ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলার দ্রুত রায় এবং রায় কার্যকর হলে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। ধর্ষণের মামলার শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, আমরা মানবাধিকার কর্মীরা শুরু থেকেই এ আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের প্রস্তাব করার বিপক্ষে। তিনি বলেন, ধর্ষণের মামলায় সাক্ষী না পাওয়ায় ও আলামত দুর্বল হওয়ার কারণে অনেক সময় শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ভিকটিম এবং সাক্ষীদেরও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে বলে জানান নূর খান।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচার করতে প্রত্যেক জেলায় আলাদা বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করা প্রয়োজন। তাহলে বিচার দ্রুতগতিতে শেষ হবে। নিম্ন আদালতে বিচার হলেই তো রায় কার্যকর হয় না। সেখানে আপিল নিষ্পত্তি হওয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। কারণ হাইকোর্টে নারী নির্যাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে আলাদা কোনো বেঞ্চ নেই। ইতোমধ্যে আসামিরা জামিনে ছাড়া পায়। ফলে পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে পাল্টে যায়।
পাঁচ বছরে ৩০ হাজার ধর্ষণ মামলা :গত পাঁচ বছরে সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৩০ হাজার ২৭২টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষে একটি রিট আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে গত ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সোস্যাল প্লাটফর্ম

27,000FansLike
15,000FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ সংবাদ