7.6 C
New York
Saturday, December 4, 2021

Buy now

spot_img

কৃষক ঠকে ভোক্তাও ঠকে, লাভ শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের

অনলাইন ডেস্ক: নোয়াখালীর উপকূলীয় সুবর্ণচরের চরনঙ্গলিয়ার কৃষক আব্দুল আজিজ এবার বাড়ির আঙিনায় এক একর জমিতে শিম, করলা, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। শীতের আগাম সবজি শিম এর মধ্যেই বাজারে চলে এসেছে। পাইকারদের কাছে তিনি প্রতি কেজি শিম বিক্রি করেছেন ৪৫ টাকায়। অথচ গতকাল শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হতে দেখা গেছে ১০০ টাকায়।

রাজধানীর কাছের জেলা মানিকগঞ্জ ‘সবজির এলাকা’ নামে সুপরিচিত। এখানকার সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি এলাকার শরীফ মিয়া এবার ৬৫ শতাংশ জমিতে আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি ও লাউ চাষ করেছেন। বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। সম্প্রতি এসব সবজি বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিটি লাউ তিনি বিক্রি করেছেন ১৫-২০ টাকায়। এই লাউ গতকাল কারওয়ান বাজারে আড়তদারের মাধ্যমে ব্যাপারীরা (পাইকারি) বিক্রি করেছেন ৩০-৩৫ টাকা। আর খুচরা বাজারগুলোতে বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকায়।

শুধু শিম ও লাউ নয়- টমেটো, গাজর, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বেগুন, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ প্রায় সব কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দামের এমন তফাত রয়েছে। রেকর্ড উৎপাদনেও বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। আবার মাঠ পর্যায়ে কৃষক দাম পান না। আলুসহ কিছু পণ্য ভোক্তা সস্তায় পেলেও ঠকেন কৃষক। কৃষিকাজ করে সিংহভাগ কৃষক পরিবার সচ্ছলতার মুখ দেখতে পারে না। অধিক উৎপাদনের পরও বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও সুলভমূল্যে নিরাপদ খাবার ভোক্তার কাছে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। করোনা মহামারিকালে চাকরি হারানো ও আয় কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে খাদ্য দিবস। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো : ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ- ভালো উৎপাদনে ভালো পুষ্টি, আর ভালো পরিবেশেই উন্নত জীবন’। দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।

আজ শনিবার সকালে দিবসের প্রথমভাগে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সেমিনারের। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন। একই দিন বিকেলে খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে একটি কারিগরি অধিবেশন হবে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির বাণীতে বলা হয়েছে, মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে অপচয় কমিয়ে সুষম পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেছেন, সরকারের গৃহীত কৃষিবান্ধব নীতি ও কার্যক্রমে দানাদার খাদ্য, মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে।

উৎপাদন পরিস্থিতি: দেশে ধারাবাহিকভাবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। করোনাকালেও খাদ্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে রেকর্ড বোরো উৎপাদন হয়েছে দুই কোটি টনেরও বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এ বছর সব ফসলের উৎপাদনই বেড়েছে। মোট চালের উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৮৬ লাখ টন, গম ১২ লাখ টন, ভুট্টা প্রায় ৫৭ লাখ টন, আলু এক কোটি ছয় লাখ টন, শাকসবজি এক কোটি ৯৭ লাখ টন, তেল ফসল ১২ লাখ টন ও ডাল ফসল ৯ লাখ টন। ২০০৯ সালের তুলনায় ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চালের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩%, গমের ৪৫%, ভুট্টার ৬৭৫%, আলুতে ১০১%, ডালে ৩৭৫%, তৈলবীজে ৪২% এবং সবজির ক্ষেত্রে ৫৭৮%।

তবুও বাজার ঊর্ধ্বমুখী: পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মাথাপিছু চাল ভোগের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪১৬ গ্রাম। সেই হিসাবে দেশে চালের চাহিদা দুই কোটি ৫৮ লাখ টন। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে এর চেয়ে অনেক বেশি। তার পরও দাম বেড়েছে। চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কথা বলা হলেও সরকারি গুদামে মজুদ বাড়াতে এবং বাজারে দাম কমাতে এখন চাল আমদানি করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে বাজারে সরু চাল ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৪৬ থেকে ৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, দাম বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ, বড় কোম্পানিগুলো চালের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। বড় মিলগুলোতে যে পরিমাণ ধান বা চালের মজুদ থাকে, তাতে চাইলেই তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এদিকে মুরগির দামও বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা। বাজারে এখন বেশিরভাগ সবজির দাম ৬০ টাকা কেজির ওপরে। এর মধ্যে নিত্য ব্যবহূত সাধারণ কয়েকটি সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি।

ঠকছেন কৃষক: কৃষকরা সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন ধানের দাম নিয়ে। গত বোরো মৌসুমে তারা ধানের দাম কম পেয়েছেন। দেশে আলুর চাহিদা ৯০ লাখ টন। কিন্তু গত মৌসুমে পরিবেশ অনুকূলে থাকায় উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ১৪ লাখ টন। সে হিসাবে আলু উদ্বৃত্ত হয়েছে ২৪ লাখ টন।

উৎপাদিত আলু থেকে দেশের ৪০০ হিমাগারে ৪০ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। করোনায় হোটেলসহ সবকিছু বন্ধ থাকায় ৬৫ শতাংশ আলুই বিক্রি হয়নি। দাম না পেয়ে প্রায়ই সবজি গরুকে খাওয়াতে অথবা ফেলে দিতে বাধ্য হন চাষিরা। পোলট্রি খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা সংকটে মুরগি ও ডিমের হাজার হাজার ছোট খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এবার কোরবানির ঈদে ২৯ লাখ পশু অবিক্রীত থেকে গেছে। দাম পাননি খামারিরা।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের (খানি) সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ বলেন, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পান না কৃষক। কৃষককে লাভবান করার জন্য কোনো কৌশল নেই। মার্কেটের ওপর কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করেন। পৃথিবীর বহু দেশে সরকার কৃষককে মূল্য সহায়তা দেয়। বাংলাদেশে কোনো কৃষি মূল্য কমিশনও নেই। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। তাদের লোকবল নেই, তাদের ওয়েবসাইটে আপডেট তথ্যও নেই।

কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়ে এ গবেষক বলেন, মূল্য কমিশনে কৃষক, ভোক্তা, সরকারের প্রতিনিধি থাকবে। তারা কোনো ফসল উঠলে মূল্য নির্ধারণ করবে। তখন কৃষক দাম পাবেন। কৃষকের সরকারের কাছে কোনো বিষয় নিয়ে দরকষাকষির জায়গা নেই। ফলে বাজারে একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র শক্তিশালীভাবে সক্রিয় রয়েছে।

নিরাপদ খাদ্যের অভাব: কৃষি উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ মাছে রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। কৃষিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহারও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। খামারের মাছ-মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক আর ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত খাবার দেওয়া হচ্ছে। খাদ্যচক্রে আরও দূষণের ঝুঁকি আছে। খাদ্য উৎপাদনে সঠিক জ্ঞান ও অসাধুতা এবং বাজারজাতকরণ ও বিপণনে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য জোগানে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

খাদ্য উৎপাদন, বাজার পরিস্থিতি, কৃষকের সমস্যা ও খাদ্য নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বেশি দামে চাল কিনতে হলেও আয় বেড়ে যাওয়ায় জনগণের মধ্যে কোনো অস্বস্তি নেই। সবজিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বাজার ব্যবস্থাপনার দায় রয়েছে। যেখানে ফুলকপি চাষ হচ্ছে, সেখানে তা বেচাকেনা চলছে ১০-১৫ টাকায়। কিন্তু ঢাকায় আনার পর একই জিনিসের দাম হয়ে যায় ৪০-৫০ টাকা। কারণ রাস্তায় চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেটের দখলে। তাই হাত ঘুরে ঘুরে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। ক্ষেত থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, চাহিদা এবং উৎপাদনের তথ্য-উপাত্তে বিভ্রাট এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট বলে তিনি মনে করছেন। এসব সংকট নিরসনে সরকার তৎপর রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সোস্যাল প্লাটফর্ম

27,000FansLike
15,000FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ সংবাদ