22.2 C
New York
Thursday, September 16, 2021

Buy now

spot_img

উগ্রপন্থিদের ঘিরে দেশে ব্যাপক সতর্কতা

দুই দশক পর আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে বাংলাদেশে সক্রিয় উগ্রপন্থিদের নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে সতর্কতা-নজরদারি বাড়িয়েছেন গোয়েন্দারা। সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হয়েছে বাড়তি পদক্ষেপ।

এরই মধ্যে তালেবান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশি তিন তরুণ ঘর ছেড়েছে বলে সমকাল জানতে পেরেছে। যারা ঘর ছেড়েছে, তাদের মধ্যে এক তরুণের পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। উগ্রপন্থিদের তৎপরতার ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক কর্মকর্তাও গতকাল সমকালকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জিহাদের উদ্দেশ্যে পরিবার-পরিজন ও নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে এ ধরনের ঘর ছাড়াকে জঙ্গি সংগঠনে ‘হিজরত’ বলা হয়। যে তিন তরুণ আফগানিস্তান যেতে ঘর ছেড়েছেন, তাদের একজন আব্দুর রাজ্জাক খান (২০)। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরের বাঙ্গরায়। বড় ভাইয়ের সঙ্গে সিলেটের কোতোয়ালি এলাকায় বসবাস করতেন তিনি। বাসার কাউকে কিছু না বলেই চলতি বছর ২৫ মার্চ তিনি ঘর ছাড়েন। এর পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। বাসার কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই তার।

এ ঘটনায় রাজ্জাকের ভাই সালমান খান গত ১ এপ্রিল সিলেটের কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ঢাকার অদূরে বছিলা এলাকা থেকে আনসার আল-ইসলামের চার জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তিন-চারজনের একটি দল তালেবানের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর ছেড়েছে। তাদের মধ্যে রাজ্জাক রয়েছেন।
রাজ্জাকের ভাই সালমান খান গতকাল সমকালকে বলেন, সিলেটের মদনমোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল রাজ্জাক। ছোটবেলা থেকে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। কখনও দাড়ি কাটত না। হুজুরদের সঙ্গে মেলামেশা ছিল। ২৫ মার্চ কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছাড়ে। পরে পুলিশ থেকে তদন্ত করে সর্বশেষ আমাদের জানায়, আমার ভাই আফগানিস্তানে গেছে। রাজ্জাকের সঙ্গে সিলেটের লালাবাজারের এক মাদ্রাসাছাত্রও নিখোঁজ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেও আফগানিস্তান গেছে।

আফগানিস্তানের উদ্দেশে ঘর ছাড়া ওই তরুণ হলো সিলেটের মাদ্রাসাছাত্র শিব্বির রহমান। প্রায় পাঁচ মাস ধরে তার খোঁজ নেই। মোবাইল ফোনও বন্ধ। পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি তার।

তালেবানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হিজরত করেছে নোয়াখালীর এক তরুণও। সে স্থানীয় একটি দোকানে চাকরি করত।

এ ছাড়া আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আরও পাঁচজনের আফগানযাত্রা ঠেকানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে চারজনের নাম জানা গেছে। তারা হলো- জসিমুল ইসলাম, আব্দুল মুকিত, আমিনুল হক ও ইখতিয়ার।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে যাওয়ায় একটা হুমকি তৈরি করবে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়েছে। এটাকে পুঁজি করে ধর্মীয় উগ্রবাদকে অন্যদের মধ্যে আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখতে পারে তালেবান। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তারা অন্ধকার পথে নেবে। আমাদের দেশ থেকেও কেউ কেউ এরই মধ্যে আফগানিস্তানের দিকে রওনা হয়েছে। সেখানে যাওয়ার জন্য কেউ কেউ আত্মগোপনে আছে। সামনের দিনে আরও সতর্কতার সঙ্গে চলমান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে। পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য সংস্থা নজরদারি বাড়িয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষক এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী সমকালকে বলেন, সিরিয়ায় আইএসের পতনের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিল, তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তালেবান উত্থান ধর্মীয় উগ্রবাদের জায়গা থেকে গোটা বিশ্বের জন্য অশনিসংকেত। উপমহাদেশের জন্য এটা আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

সিটিটিসির প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, তালেবান শক্তি বেড়ে যাওয়ায় অনলাইনে উগ্রপন্থি কারও কারও মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। পুরো বিষয়টির ওপর তীক্ষষ্ট নজরদারি রয়েছে।

দেশে উগ্রবাদের অতীত-বর্তমান প্রেক্ষাপটকে মোটাদাগে তিনটি স্তরে ভাগ করেন নিরাপত্তা বিশ্নেষকরা। তাদের মতে, দেশে সক্রিয় জঙ্গিবাদের প্রাথমিক ধাপের সূচনা ঘটে আফগানফেরত মুজাহিদদের হাত ধরে। এর গোড়াপত্তন হয় নব্বই দশকের শুরুতে। প্রথম স্তরে ছিল তালেবান অনুসারী মুসলিম মিল্লাত বাহিনী ও হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি)। দ্বিতীয় স্তরে জন্ম নেয় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। তৃতীয় স্তরে উত্থান ঘটে আনসার আল-ইসলাম (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) ও নব্য জেএমবির। এর মধ্যে আনসার আল-ইসলাম আল কায়দার অনুসারী এবং নব্য জেএমবি নিজেদের ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শে বিশ্বাসী বলে দাবি করে।

১৯৮৯ সালে হুজিবি প্রতিষ্ঠা করেন যশোরের মনিরামপুরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকী। ওই বছরই আফগানিস্তানে মাইন অপসারণের সময় ফারুকী নিহত হন। এর পর ১৯৯২ সালে এপ্রিলে ঢাকায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন ডেকে হুজি-বির আত্মপ্রকাশের বিষয়টি জানানো হয়। আফগানফেরত মুজাহিদদের অধিকাংশ এর সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের অনেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন। আফগান যুদ্ধের সময় তারা গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং ভারী অস্ত্র চালানোর পারদর্শিতা অর্জন করেন।

বিশ্নেষকরা বলছেন, দেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের যোগসূত্র রয়েছে। তাই সেখানে তালেবানের নতুনভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসাটা এখানেও ঝুঁকি তৈরি করবে।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সোস্যাল প্লাটফর্ম

27,000FansLike
15,000FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ সংবাদ