প্রার্থীর কাছে টাকা ধার নিয়েছিলেন নিয়োগ বোর্ডের সদস্য

Spread the love
ফাইল ছবি

রাজশাহী ব্যুরো ও রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের সময় চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও বিভাগের সভাপতি জামাতপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল হান্নান। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার একটি অডিও রেকর্ডিং ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সেসময় উপ-উপাচার্য সংবাদ সম্মেলন করে জানান, চাকরিপ্রার্থী বিভাগের সাবেক ছাত্র নুরুল হুদা বিভাগের সভাপতির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করেন।

এ বিষয়ে শনিবার দুপুরে রাজশাহী শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করেন চাকরিপ্রার্থী সেই নুরুল হুদা। তিনি দাবি করেন, বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল হান্নানকে ২ লাখ টাকা ধার দেন। অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ওই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। গত ৮ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে টাকা ধার নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন হান্নানও।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নুরুল হুদা বলেন, বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান আমার কাছ থেকে টাকা ধার নেন। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি আমার থেকে ২ লাখ টাকা ধার নিয়ে ১২ নভেম্বর তা পরিশোধ করেন। আমার নিকট থেকে আইন বিভাগের সভাপতি যে টাকা ধার নেন এবং পরিশোধ করেন সে সব তথ্য আমি উপ-উপাচার্য চৌধুরী জাকারিয়া এবং তার ভাগনে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর গাজী তৌহিদুর রহমানের মাধ্যমে প্রশাসনকে অবহিত করি। ওই বছরের ১১ ও ১২ নভেম্বর এসব তথ্য উপ-উপাচার্যের ভাগনের কাছে ম্যাসেঞ্জার ও ইমেইলে প্রেরণ করি।’ এ সময় তিনি এ বিষয়ে বার্তা আদান-প্রদানের একটি প্রিন্ট ডকুমেন্ট দেখান। তবে ম্যাসেঞ্জারে দেখা যায়, গাজী তৌহিদুর রহমান তাকে (নুরুলকে) ‘হাই’ লেখেন এর উত্তরে নুরুল হুদা ইংরেজিতে ‘হ্যালো’ লেখেন এবং ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো ২ লাখ টাকা লেনদেনের একটি ছবি পাঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে তিনটি প্রভাষক পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। এতে বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র নুরুল হুদা আবেদন করেন। আবেদনকারী নুরুল হুদা স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৬৫ ও স্নাতকোত্তরে ৩.৬০ পান। আইন অনুষদে সেরা হওয়ায় ২০১৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক এবং ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পান।

বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিনটি প্রভাষক পদের বিপরীতে আবেদন করেন ৪১ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৫০ বা এর ঊর্ধ্বে ফল রয়েছে। অন্যদিকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৩৩ জন আবেদনকারী ফল ৩.৫০ বা এর উর্ধ্বে। গত বছরের ১৩ নভেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা হয়। ১৭ নভেম্বর সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ অনুমোদিত হয়। বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান সাইমুন তুহিন নামে এক চাকরিপ্রার্থী। নিয়োগের কিছুদিন পর সাইমুন তুহিনের সঙ্গে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক জাকারিয়ার মেয়ের বিয়ে হয়। অন্য দু’জন নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম ঠান্ডুর মেয়ে নূর নূসরাত সুলতানা ও বিভাগের সাবেক ছাত্রী বনশ্রী রাণী। নিয়োগপ্রাপ্তরা সিন্ডিকেট সভার পরদিনই বিভাগে যোগদান করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়োগ বোর্ডে উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ডা. রুস্তম উদ্দিন আহমেদ ও এক্সপার্ট হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহজাহান মণ্ডল উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আব্দুল হান্নান নিয়োগ বোর্ডের সদস্য হওয়ার পরও কেন তাকে টাকা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান চাকরিপ্রার্থী নুরুল হুদা। এতদিন পর সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এতদিন ডকুমেন্টস ছিল না। আমি সব তথ্য সংগ্রহ করার জন্য সময় নিয়েছি। এখন সব প্রমাণ আমার কাছে আছে।’

সামগ্রিক বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানান।

ফাঁস হওয়া রেকর্ডটি এডিটিং করা উপ-উপাচার্যের এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি এডিটিং নয়, আসল রেকর্ডিং, তবে কথপোকথন আরও ছিল। সেটি সংক্ষিপ্ত করে প্রকাশ করা হয়েছে।’

আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কথাবার্তা হয়েছে, তাহলে প্রশাসন ঘুষ চেয়েছে নাকি আপনারা নিজে থেকে দিতে চেয়েছেন?’ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না বলে উত্তর দেন।

চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার বিষয়ে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সে সময় আমি সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত বলেছি। এক বিষয়ে বারবার বলা তো সম্ভব না।’

এ বিষয়ে জানতে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়াকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। কিন্তু ফোন রেকর্ডিং ফাঁসের পর তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ইমেইলে তার লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে তিনি বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পারেন নুরুল হুদা চাকরি পেতে অসাধু কিছু ব্যক্তির কবলে পড়ে আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তার এহেন অসাধুকর্ম রোধকল্পে খোঁজ নেওয়ার জন্য হুদার স্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন তিনি। তার যে রেকর্ডিং ফাঁস হয়েছে সেটি আংশিক ও খণ্ডিতভাবে এডিটিং করে প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার ৫৫ সেকেন্ডের একটি অডিও ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়। এতে আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র ও বিভাগের শিক্ষক পদে চাকরিপ্রার্থী নুরুল হুদার স্ত্রী সাদিয়ার সঙ্গে তার কথপোকথন শোনা যায়। যেখানে অধ্যাপক জাকারিয়া জানতে চান তারা কতটাকা দিতে রেডি (প্রস্তুত) আছে?।