ঘরে থাকতেই হবে, করোনা আক্রান্ত দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ৮ মার্চ প্রথম তিনজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর ৩১ মার্চ নতুন করে দু’জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর মোট আক্রান্ত ৫১ জনের পৌঁছায়। এরপর ১ এপ্রিল তিনজন, ২ এপ্রিল দু’জন এবং ৩ এপ্রিল পাঁচজন শনাক্ত হয়। কিন্তু নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর পর গত শনিবার ৯ জন শনাক্ত হয়। গতকাল রোববার তা দ্বিগুণ হয়ে ১৮ জনে পৌঁছায়। গত ২৮ দিনে দেশে মোট ৮৮ জন আক্রান্ত হলেন। এই ভাইরাসে গতকাল একজনের মৃত্যুসহ মোট মৃতের সংখ্যা ৯ জনে পৌঁছেছে।

চীন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতেও এভাবে ধাপে ধাপে বিস্তৃতি ঘটিয়ে ভাইরাসটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার মিরপুর, টোলারবাগ, বাসাবো এবং ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুরের শিবচর, গাইবান্ধাসহ কয়েকটি অঞ্চলে সংক্রমণের হার বেশি পাওয়া যাচ্ছে। করোনা সংক্রমণের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশেও ভয় জাগাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন যে হারে বাড়ছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘরে থাকার বিকল্প নেই। এটা কঠোরভাবে মানতেই হবে। করোনা রোধে সরকারও সাধারণ ছুটি পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, চীন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমে দু-একজনের মাধ্যমে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে বিস্তৃতি ঘটিয়ে তা মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশও সেই দিকে যাচ্ছে এবং আমরা নিজেরাই সেই পথ তৈরি করে দিচ্ছি। সর্বশেষ গত শনিবার শ্রমিকদের ঢাকামুখী যাত্রার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি ছুটি ঘোষণার পরও গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য নোটিশ পাঠিয়ে নিয়ে এলেন। হাজার হাজার শ্রমিক ট্রাকে, আবার কেউবা হেঁটে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার কর্মস্থলে গেলেন। যে পরিমাণে জনসমাগম হলো, তা সত্যিই আতঙ্কের। আমাদের মনে ভয় জাগছে। জানিনা আমরা ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কিনা।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। সন্দেহভাজনদের দ্রুত নমুনা পরীক্ষা এবং আক্রান্তদের পৃথক করার ওপর দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন গুরুত্ব দিয়েছিল। আমরাও সেই পথ অনুসরণ করছি। সে জন্যই নমুনা সংগ্রহের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫শ’র বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এটিকে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজারে নিয়ে যেতে চাই।

জাহিদ মালেক আরও বলেন, আমাদের এখনই সময়। আমরা চাই না, এটি বেড়ে যাক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক। তাহলে ইউরোপ-আমেরিকার মতো হয়ে যাবে। তখন আমরা অনেক কষ্টে পড়ব। বিষয়টি সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্দেশনা মেনে আমাদের ঘরে থাকতে হবে।

বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি মহামারি আকার অনেক আগেই ধারণ করেছে। চীন থেকে করোনাভাইরাস এখন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে কাঁদাচ্ছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণের শুরুতে এসব দেশগুলোর পরিস্থিতি এমন ছিল না। সীমিত পর্যায়ে দু-একজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই সেটি বিস্তৃতি ঘটিয়ে মহামারি আকার ধারণ করে। বাংলাদেশও কি সেই পরিণতির দিকে যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, এখনই সেটি বলা সম্ভব নয়। তবে অন্যান্য দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমে দু-একজনের মাধ্যমে সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী থেকে ধাপে ধাপে দেশব্যাপী বিস্তৃতি ঘটেছে। চীন থেকে শুরু করে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে সেই তথ্যই পাওয়া যায়। বাংলাদেশও কিন্তু সেই অবস্থার দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনের কিন্তু বিদেশফেরত কিংবা তাদের সংস্পর্শে যাওয়ার ইতিহাস পাওয়া যায়নি। তাহলে বলা যায়, এটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যদি এটি হয়ে থাকে তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। সুতরাং পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশন ও তার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া যাবে, ততই আমরা এই ভাইরাস প্রতিরোধে সফল হব।

ডা. জাহিদের সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে কয়েকটি দেশের করোনা পরিস্থিতি বিশ্নেষণে দেখা যায়, বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়। এক মাস পর ১ ফেব্রুয়ারি এই সংখ্যা সাতজনে দাঁড়ায়। পরের মাস ১ মার্চে এই সংখ্যা বেড়ে ৭৪ জনে দাঁড়ায়। ১ এপ্রিল আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তকরণের সংখ্যা এক লাখ ৯০ হাজারে পৌঁছায়। ইতালিতে ৩১ জানুয়ারি দু’জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর ২৯ ফেব্রুয়ারি তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১০০ জনে। আর ৩১ মার্চ করোনা পজিটিভ মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫ হাজার ৮০০ জনে। স্পেনে ১ ফেব্রুয়ারি প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ১ মার্চ সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ জনে। আর ৩১ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ হাজারে। যুক্তরাজ্য ৩১ জানুয়ারি মাত্র দু’জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়, যা ১ মার্চ দাঁড়ায় ৩৬ জনে। আর ৩১ মার্চ যুক্তরাজ্যে শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৫০০ জনে। ২৭ জানুয়ারি জার্মানিতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৬ জন। ২৭ মার্চ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ হাজারে। আর ৩১ মার্চ দেশটিতে মোট ৭১ হাজার ৮০০ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। গত ২৪ জানুয়ারি ফ্রান্সে মাত্র দু’জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১২ জনের শরীরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২৪ মার্চ ২২ হাজার ৬০০ জনের শরীরে সংক্রমণ পাওয়া যায়। আর ৩১ মার্চ শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৮০০ জনে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৩০ জানুয়ারি প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর ২৯ ফেব্রুয়ারি শনাক্ত হওয়া রোগী বেড়ে দাঁড়ায় তিনজনে। আর ৩১ মার্চ সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪০০ জনে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তানে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ২৬ মার্চ সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২০০ জনে। আর ৩১ মার্চ এই সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৯০০ জনে দাঁড়ায়।

৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম তিনজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। ২৮ দিন পর আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ জনে পৌঁছেছে। মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের।

গতকাল রোববার করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১৮ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ জনে এবং মৃতের সংখ্যা ৯ জনে পৌঁছাল।

আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও তিনজন সুস্থ হওয়ার কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তারা বাড়ি ফিরেছেন। এ নিয়ে এই রোগে আক্রান্ত ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

করোনা প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরে জাহিদ মালেক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যবহূত হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে যাতে আমরা ব্যবহার করতে পারি, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

করোনা শনাক্তে জিন এক্সপার্ট মেশিন ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে জিন এক্সপার্ট মেশিন সম্পর্কে আমাদের জানানো হয়েছে। কিন্তু এই মেশিনটিতে যে কিট ব্যবহার করা হবে তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যে কোম্পানি এটি সরবরাহ করতে পারবে, তাদের আমরা দেড় মাস আগেই অর্ডার দিয়ে রেখেছি। কিন্তু তারা দিতে পারেনি। ওই কিট পেলেই হয়তো জিন এক্সপার্ট মেশিন ব্যবহার করা যাবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আক্রান্তদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ১৪টি কেন্দ্রে ৩৬৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনের পরীক্ষা হয়েছে আইইডিসিআরে। পাঁচজনের পরীক্ষা অন্যান্য ল্যাবরেটরিতে হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। তার বয়স ৫৫ বছর, তিনি পুরুষ। তিনি নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন তিনজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তাদের দু’বার পরীক্ষা করা হয়েছে।

ডা. ফ্লোরা আরও বলেন, আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ এবং তিনজন নারী। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ১২ জন ঢাকার, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরের একজন করে রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে নয়জন রাজধানীর বাসাবো এলাকার, ছয়জন টোলারবাগের এবং মিরপুরের অন্যান্য এলাকার পাঁচজন রয়েছেন।

অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।