কর্মচাঞ্চল্য কমছে স্থলবন্দরগুলোতে

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলোতে। বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে ভারত ও মিয়ানমারের। তবে যাত্রীদের আসা-যাওয়া ও পণ্য আমদানি-রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হয় ভারতের সঙ্গে। করোনা আতঙ্কে স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কমছে কর্মচাঞ্চল্য। এদিকে ভারতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বিকেল থেকে দেশটিতে ভ্রমণ (ট্যুরিস্ট) ভিসায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হচ্ছে। তবে তার আগে গতকাল থেকেই কয়েকটি স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় দুর্ভোগে পড়েন বাংলাদেশের বহু মানুষ। অন্যদিকে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিটি স্থলবন্দরেই সক্রিয় মেডিকেল টিম। তবে কিছু চিকিৎসাকর্মী অভিযোগ করেছেন, তাদের নিজেদের নিরাপত্তাসামগ্রীই অপ্রতুল।

সিলেট ব্যুরো জানায়, করোনা আতঙ্কে তামাবিল দিয়ে কেউ ভারতে যাচ্ছেন না। তবে জকিগঞ্জ ও চাতলাপুরে চলাচল স্বাভাবিক। এ তিন বন্দরেই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
তামাবিল স্থলবন্দর হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ পর্যটক আসা-যাওয়া করেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় পর্যটকের এই স্রোত এখন অনেক কমেছে। গত কয়েকদিনে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা ছাড়া তামাবিল দিয়ে কেউ ওপারে যাননি।

যশোর অফিস ও বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, করোনাভাইরাসের কারণে আজ শুক্রবার বিকেল থেকে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে পর্যটকদের ভারতে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সে দেশের সরকার। এ খবরে গতকাল বৃহস্পতিবার বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে পর্যটকের উপচেপড়া ভিড় দেখা দেয়। চিকিৎসা, ব্যবসাসহ প্রয়োজনীয় কাজ মেটাতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগেই ভারতে ছুটেছেন আগের চেয়ে দ্বিগুণ বাংলাদেশি।

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, গতকাল চিকিৎসা ভিসার বাইরে কাউকে আগরতলায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক যাত্রী আগরতলা ইমিগ্রেশন থেকে ফিরে এসেছেন। তবে যেসব যাত্রীর আগরতলা বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট ছিল, বাংলাদেশ পুলিশের অনুরোধে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়।

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুরে সীমান্ত উপজেলা কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে ঢুকলে চোখে পড়ে মানুষের ভিড়। কয়েকশ’ শ্রমিক মিয়ানমার থেকে আসা অর্ধশতাধিক কার্গো ও ছোট-বড় ট্রলার থেকে মালপত্র খালাস করে দ্রুতগতিতে সরাসরি ট্রাকে লোড করছেন। এই বন্দরে সব মিলিয়ে সাতটি জেটি রয়েছে। এসব জেটিতে কাঠ, পেঁয়াজ, আচার, শুঁটকিসহ বিভিন্ন পণ্য খালাসে ব্যস্ত ছিলেন শ্রমিকরা। সেখানকার অধিকাংশ শ্রমিক রোহিঙ্গা। মেডিকেল টিমের তিন সদস্য পণ্য নিয়ে আসা মিয়ানমারের নাগরিকদের থার্মাল প্লাস দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তবে বন্দরের নিরাপত্তা কর্মী, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের গ্লাভস ও মাস্ক পরতে দেখা যায়নি।

সীমান্ত বাণিজ্যের আওতায় মিয়ানমারের সঙ্গে টেকনাফ স্থলবন্দর ও করিডোরে বিভিন্ন পণ্য ও পশুবোঝাই জাহাজ ও ট্রলারের যাতায়াত রয়েছে। কিন্তু করিডোরের চেয়ে স্থলবন্দরে মিয়ানমারের মংডু, আকিয়াব ও ইয়াঙ্গুন থেকে মালপত্র বেশি আসে। ফলে স্থলবন্দরে মেডিকেল টিম কাজ করছে। কিন্তু শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্তকরণে কোনো কার্যক্রম নেই। এই করিডোরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে ছোট-বড় আটটি ট্রলারে ৭শ’র বেশি গরু-মহিষ এসেছে। এসব ট্রলারে সে দেশের শতাধিক নাগরিক রয়েছেন। তবে তাদের কারও করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্তকরণে পরীক্ষা করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে গবাদিপশু আমদানিকারক আবদুল্লাহ মনির বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা ট্রলারের মাঝিমাল্লাদের কূলে উঠতে দেওয়া হয় না। তারা গবাদিপশু নামিয়ে দেওয়ার পরপরই ফিরে যান। তারা এখানে রাত যাপন করেন না।

কলকাতা প্রতিনিধি জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় আজ থেকে বন্ধ হয়ে যাবে ভারত-বাংলাদেশ পেট্রাপোল স্থলবন্দর। পেট্রাপোলে সীমান্ত বাণিজ্য চালু থাকলেও বন্ধ করে দেওয়া হবে বিদেশিদের যাতায়াত। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়বে সীমান্তের দু’পারের ব্যবসা।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই দিনাজপুরের বিরল ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের করোনাভাইরাসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিরল ইমিগ্রেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শুধু একজনের শরীরে রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাকিদের শুধু মাস্ক ছাড়া অন্য কোনো নিরাপত্তাসামগ্রী নেই।

হিলি (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দেশে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এর কোনো প্রভাব পড়েনি দিনাজপুরের হিলি চেকপোস্টে। এর ফলে এই চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আসা-যাওয়া করছেন ৪৫০-৫০০ যাত্রী। এ ছাড়া ভারত থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকচালক ও হেলপারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিদিন হিলি চেকপোস্ট দিয়ে ভারত, নেপাল, ভুটানসহ অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন যাত্রীরা।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে করোনাভাইরাস ঝুঁকি নির্ণয় কেন্দ্র এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৬৪৭ জন ভারতফেরত যাত্রীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। তবে এখনও করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। এদিকে চার দিন আগে থেকে ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপারদের শারীরিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ ভোমরা স্থলবন্দরে তাদের জনবল বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে এই বন্দরে ২৫ স্বাস্থ্যকর্মী পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে আসা-যাওয়া করে থাকেন। করোনাভাইরাস যাতে ছড়াতে না পারে সে জন্য ভোমরা স্থলবন্দরে জারি করা হয়েছে সতর্কতা। কাজ করছে মেডিকেল টিম। দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা চেকপোস্ট সীমান্তের মেডিকেল টিম গত ১১ মার্চ এক ভারতীয় নাগরিককে করোনা সন্দেহে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দিয়ে ফেরত পাঠায়।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার আকস্মিকভাবে বিনা নোটিশে ভারতে যাত্রী যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে দর্শনা চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন বিভাগ। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনা চেকপোস্টে আসা ভারতগামী যাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা বেশকিছু যাত্রীও ভারতীয় ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, করোনাভাইরাস আতঙ্কে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। আগে এ বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ’ মানুষ যাতায়াত করতেন। পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে তিন থেকে পাঁচশ’। করোনা আতঙ্কে গত কয়েক দিন ধরে এই বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যাত্রীদের পারাপার কমে গেছে। শুক্রবার বিকেল থেকে ঘোষণা দিয়ে বন্ধ হতে পারে চতুর্দেশীয় এই ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। তবে বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো চিঠি বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

গতকাল দুপুর পর্যন্ত এই ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে একশ’র মতো যাত্রী পারাপার হয়েছেন। কমে গেছে পণ্য আমদানি- রপ্তানি। বেকার হয়েছেন বন্দরের কুলি-শ্রমিকসহ বন্দর সংশ্নিষ্টরা।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে পর্যটক ও ট্রাকচালকদের করোনাভাইরাস শনাক্তে এ আর থার্মোমিটার বা ডিফজটাল থার্মোমিটারই একমাত্র ভরসা। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগকারী এই স্থলবন্দরে থারমাল স্ক্যানারের পরিবর্তে এই থার্মোমিটার দিয়ে যাত্রী ও ট্রাকচালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরের ওপারে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা, নেপাল এবং ভুটান সীমান্তে ভারতের রানীগঞ্জ ও জয়গাঁ।