টাঙ্গাইল কালিহাতীতে নদী-খননের নামে বালি বিক্রির মহোৎসব-উদাসীন পাউবো

Spread the love

মোঃ শরিফুল ইসলাম মাহফুজ, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় নদী খননের নামে নদী হতে বালি ও মাটি উত্তোলণ করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। অনিয়ম তান্ত্রিকভাবে অনঅনুমোদিত ড্রেজার দিয়ে বালি ও মাটি উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নদী ও নদী পাড়ের বাসিন্দারা বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার উদাসীন রয়েছে পাউবো। জানা যায় বুড়িগঙ্গা নদী (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলি-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) পুনরুদ্ধার প্রকল্প (২য় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কালিহাতী উপজেলার নিউ ধলেশ্বরী ও পুংলি নদীর কি.মি. ০.০০ হতে কি.মি. ২০.০০ এর মধ্যে ১৪.৫০ কি.মি. দৈর্ঘ্য পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষন বাস্তবায়নের জন্য এশিয়ান ড্রেজার লিঃ ওয়েষ্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং লিঃ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) সংক্ষেপে এ.ডি.এল-ডব্লিউ.ই.এল(জেডি) নামক একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে গত ২১/১২/২০১৭ ইং তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় টাঙ্গাইল পওর’র বিভাগ হতে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ নং ড২৭/ইজজচ-ঙগউ২৭/২০১৭-১৮ কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ওই কার্যাদেশে ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ কাজ শুরু ও ২৮ জুন ২০১৮ কাজ শেষ করার বাধ্যবাদকতা ছিল। আর প্রকল্প ব্যয় ধরা ছিল ৫৪ কোটি ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৩ শত ৬১ টাকা ২০ পয়সা। বিশাল এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল নদী খনন করে পানি প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বুড়িগঙ্গাকে দূষণ মুক্ত করা, বুড়িগঙ্গা তুরাগ রুটে সারাবছর নৌ-চলাচলের উপযোগী করা সহ সেচ ও মৎস উন্নয়ন। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম ছিল ভূমি অধিগ্রহণ, গাইড বাধ নির্মাণ কায়িক শ্রম ও ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন, সেডিমেন্ট বেসিন নির্মাণ ও সংরক্ষণ কাজ সহ নদীতে ব্রীজের ফাউন্ডেশন ট্রিটমেন্ট, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ।

নদী খননে সরকারের আসল উদ্দেশ্য কে ব্যহত করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য সাব-ঠিকাদার নিয়োগ করে অবৈধ ৪” ব্যাসের বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করে বালি উত্তোলণ ও বিক্রির মহোৎসবে মেতে ওঠে। এ পর্যায়ে নদী ভাঙ্গন প্রবন এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ক্ষোভে ফেটে ওঠে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের দাবী অধিগ্রহণের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও তরিৎ ভূমি অধিগ্রহণের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ সহ নিয়ম তান্ত্রিক উপায়ে নদী খননে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে খনন কাজ সম্পন্ন করা।

এক পযায়ে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় ডি.পি.পি সংশোধনের প্রয়োজনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ষ্টিয়ারিং কমিটির সভায় উক্ত ড্রেজিং কাজ সহ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িতব্য অন্যান্য কাজও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ছত্র ছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিও বালুখোকো নামে পরিচিতরা অবৈধ ভাবে নদী হতে বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করে বালি উত্তোলণ করে বিক্রির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় হাজার কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ হয় নদী আর নদী পাড়ের মানুষ। প্রকল্পের ২য় সংশোধিত ডি.পি.পি অনুমোদনের পর সম্প্রতি নদী খননের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ২৫/০৫/২০২০ সালের মধ্যে কাজ সম্পন্নের নির্দেশনা প্রদান করা হলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মহাআনন্দে আত্মহারা হয়ে অবৈধ ভাবে “মা” এন্টার প্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব কন্ট্রাক্ট দিয়ে নতুনভাবে কালিহাতী অঞ্চলে নিউ ধলেশ্বরী-পুংলি নদী খননের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কার্যাদেশে ০-২০ কি.মি. উৎসমূখে ০-৩ কি.মি. পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় কাজ করার কথা আর বিয়ারা মারুয়া থেকে এলেঙ্গা বাজার ব্রীজের ভাটীতে ৩০০ মিটার পর্যন্ত তাদের নব প্রস্তুতিতে “মা” এন্টারপ্রাইজের অন্তরালে টাঙ্গাইল থেকে নির্বাসিত এক রাজনৈতিক নেতার নাম ভাংগিয়ে বখাটে মাস্তান প্রকৃতির শতাধিক লোক নিয়ে নদী খনন এলাকায় পেশী শক্তি প্রদর্শন করে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্বাছ আলীর নেতৃত্বে শক্তির মহড়া দিয়ে এলাকার মানুষদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নতুন করে নদী খনন কাজ শুরু করে।

একটি সূত্র জানায়, সাব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান “মা” এন্টার প্রাইজ সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলকে প্রলুব্ধ করে তাদেরকে আবার উপ-সাব কন্ট্রাক্ট দেয় এবং উপ-সাব কন্ট্রাক্ট পাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে প্রতি ৪” ব্যাসের বাংলা ড্রেজার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। “মা” এন্টারপ্রাইজ যাদেরকে উপ-সাব কন্ট্রাক্টে নদী খননের জন্য নিযুক্ত করেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হযরত আলী চেয়ারম্যান ২৫০ মিটার, আব্দুল আলীম চেয়ারম্যান ৫০০ মিটার, ভাবলার লাবু ২৫০ মিটার, ফরজ আলী ২৫০ মিটার, চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক ভূইয়া ২৫০ মিটার তার ছেলে রাসেল ভূইয়া ৫০০ মিটার, বল্লভ বাড়ীর বাছেদ ২৫০ মিটার, সরাতৈল গ্রামের জহুরুল ইসলাম ৫০০ মিটার, চাঁন মিয়া ২৫০ মিটার, গুলজার ২৫০ মিটার, কুর্শাবেনু গ্রামের রফিক খান ৫০০ মিটার, আনিছ মিয়া ২০০ মিটার, নুরুল ইসলাম ৩০০ মিটার, পটল গ্রামের সোহেল ৫০০ মিটার, ইউপি সদস্য সুলতান ৫০০ মিটার, সাবেক ছাত্রনেতা মশিউর ৫০০ মিটার, ইউপি সদস্য সোনা মিয়া ২৫০ মিটার, এলেঙ্গা পৌর এলাকার লাভু মিয়া ৫০০ মিটার, বাশি গ্রামের জলিল মিয়া ৩০০ মিটার, মাসুদ ৩০০ মিটার। এরা নদীতে শতাধিক বাংলা ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে বালি উত্তোলন করে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিদিন শতশত ট্রাক বালি বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সাব-ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ভয়ে কেউ কথা বলতে না পারলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ৬৭ ব্যক্তি কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি আবেদন পত্র দাখিল করেছেন গত ০৭/০১/২০২০ ইং তারিখের ওই আবেদনে তারা ভূমি অধিগ্রহণ সহ ক্ষতিপূরণ প্রদান ও নিয়ম বহিঃভূত ভাবে নদী খননে তাদের ক্ষয়ক্ষতি লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, টাঙ্গাইল পওর’র নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ০৭/০১/২০২০ ইং তারিখের এক পত্রে টাঙ্গাইল জেলা প্রসাশক কালিহাতী উপজেলাধীন নিউ ধলেশ্বরী-পুংলি নদীতে বাপাউবো অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়নে নির্ধারিত দৈর্ঘ্যে অনঅনুমোদিত ভাবে ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়নে উক্ত কাজে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত বাংলা ড্রেজার ব্যবহার প্রসঙ্গে একটি অভিনব পত্র দিয়েছেন। উক্ত পত্রে ১২” ব্যাসের ৫টি ও ১০” ব্যাসের ১টি ৪” ব্যাসের ৫টি সহ ১১টি ড্রেজার ব্যবহারে ৩ জনকে অভিযুক্ত করেছেন। যদিও শতাধিক ৪” ব্যাসের বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করা হলেও বিষয়টি ওই পত্রে অজ্ঞাত কারণে এরিয়ে যাওয়া হয়েছে।

নদী খনন কাজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া কার্যাদেশের ট্রাম্স এন্ড কন্ডিশনে স্পষ্ট করে বলা আছে কোন ক্রমেই ১৮” থেকে ২২” ব্যাসের কম ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোন ক্রমেই তারা কোন প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে পারবে না কার্যাদেশ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকেই একক ভাবে কাজ করতে হবে। সিডিউলের মেজারমেন্ট অনুযায়ী খনন কাজ করতে হবে এবং খনন কাজে উত্তোলিত বালি নিরাপদ দূরত্বে জড়ো করে ওপেন টেন্ডারে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারী কোষাগারে জমা হবে।

কার্যাদেশ প্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সাব-ঠিকাদার নিয়োগ করে শুধু সরকারী নির্দেশ অমান্য করে ক্ষ্যান্তই হননি তারা সিডিউল বহিঃভূত খনন কাজ করে বেশী বালি যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই ড্রেজার বসিয়ে নদীর প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্থ করা ছাড়াও নদী তীরবর্তী এলাকা ভাঙ্গন প্রবন হওয়ার পথকে সুগম করে পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্থ করার হীন প্রচেষ্টায় মেতে উঠেছেন এবং উত্তোলিত বালি বিক্রি করে অনৈতিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সরকারকে প্রাপ্ত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন।

নদী খনন কাজে মেজারমেন্ট অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জোগার চর ও সর্বনি¤œ ৫ ফুট আনালিয়া বাড়ী ধলা টেংগুরে কথা থাকলেও কোন খনন কারীই নিয়ম মানছেন না। তারা যেখানে বালি বেশি পাওয়া যায় সেখানেই খনন কাজ শুরু করে থাকেন। নদী খনন কাজে সাব-ঠিকাদার নিয়োগ ও উত্তোলিত বালি বিক্রির বিষয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ আলমগীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান নিয়ম বহিঃর্ভূত সাব-ঠিকাদার নিয়োগসহ উত্তোলিত বালি বিক্রি করার কোন সুযোগ নাই। আমাদের সাইট এস/ও নিয়োমিত প্রকল্প মনিটরিং করছেন।

নিয়ম বহিঃর্ভূত সাব-ঠিকাদার নিয়োগ ও বাংলা ড্রেজার দিয়ে নদী খনন কাজ পরিচালনা ও উত্তোলিত বালি বিক্রির বিষয়ে সাইট এস.ও রবিউল জানান আমাদের কাজের সীমাবদ্ধতা আছে। স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবে সব সময় সঠিকভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না। তারপরও আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট আছি। তিনি আরোও জানান খনন কাজে বাংলা ড্রেজার ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ইতিমধ্যে প্রকল্পটির আনুমানিক ১০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ড্রেজারের স্থানীয় প্রতিনিধি কুতুব উদ্দিনের কাছে “মা” এন্টারপ্রাইজকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া ও তারা পুনরায় উপ-সাব কন্ট্রাক্ট দিয়ে বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করে নদী খননে নদীর ক্ষতি সাধন সহ বালি বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমার সীমাবদ্ধতা আছে এবং এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আমাদের একটি মিডিয়া উইং আছে বলে তিনি মিডিয়ার উইং এর দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা জনৈক বাদলের সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করেন।

এশিয়ান ড্রেজারের মিডিয়া উইং এর দায়িত্ব প্রাপ্ত বাদলের সাথে যোগাযোগের জন্য তার মুঠফোনে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই।