আমি নারী, আমার জন্য কত দিনে এই দেশ নিরাপদ হবে: ফাতেমাতুজ জোহরা এলি

Spread the love

ধর্ষণ একটি মারাত্নক সামাজিক ব্যাধি।ধর্ষণ আমাদের সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ হলেও প্রতিদিনের পত্রিকায় ধর্ষণের নিউজ দিয়েই দিনের যাত্রা হয়। ফেনীর সোনাগাজির মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে নির্মম ভাবে হত্যা করার পর সারাদেশে ন্যায় বিচারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়।নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারে ফাসির   রায় হয়েছে।কিন্তু এর পরও দেশে নারী নির্যাতন  বন্ধ হয়নি। দেশে নারী নির্যাতনের এবং ধর্ষনের খবর পত্রিকায় নিয়মিত  আসছে।মাত্রাহীন ভাবে বেড়েই চলছে এর গতি।কাঠামো কিংবা কার্যগত ব্যাবস্থাপনার মত বিকৃত মানষিকতার দিকেও আমরা যথেষ্ট এগিয়ে।আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা নানা কর্মসূচি করেও ট্রাইবুনালের দীর্ঘসুত্রিতা, প্রশাসনিক কাঠামোগত দুর্বলতা, আপিলের সুযোগ ইত্যাদির কারনে অপরাধী শাস্তি বিলম্বতার কারণে চলমান প্রক্রিয়াধীনেও ধর্ষণের নতুন নতুন খবর আসে।ধর্ষণের মত ঘৃণ্য কাজের শাস্তির জন্য আমাদেরকে আন্দোলন করতে হয়!

গত রবিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাস থেকে নামার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে।পরদিন ঘটানাস্থল থেকে বই-কলম-ঘড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। একটা দেশ নারীদের জন্য কতটা অনিরাপদ হলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে বাস থেকে নামার পর তাকে তুলে নিয়ে  গিয়ে ধর্ষণ করতে পারে।যেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীতে নিজেকে ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা সেখানে একজন সাধারণ নারী নিজেকে কতটা অনিরাপদ ভাবতে পারে!  

আমি একজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী। আমাকেও প্রতিদিন বাসে করে বাসায় ফিরতে হয়।নানান শংকা আর ভয়-ভীতির মধ্য দিয়েই প্রতিটা দিন অতিবাহিত হয়।একাডেমিক বা অন্য কোন কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের  বাস মিস করলে নানান ভূগান্তিতে পড়তে হয় আমাকেও।কয়েকবার রাহুকরাল গ্রাসীদের শিকারে পড়েও ভাগ্যক্রমে বেচে গিয়েছিলাম।সশব্দে প্রতিবাদ করেছি।কিন্তু এমন হাজারো নারী প্রতিনিয়তই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।সমাজ বাস্তবতার ভয়ে কাউকে কিছু বলতেই পারছেন না।যা অপরাধীদের অপরাধ করার উৎসাহ যোগান দেয়।আবার অনেকেই এসব পারিপার্শ্বিক   অবস্থানের কারণে পরিবারের দুশ্চিন্তা , নিজের মধ্যই একধরনের ভীতিকর অবস্থার তাড়নায়    নিজ থেকেই সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসেন।যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে নারীদের সীমানা। যার ফলে  বৃদ্ধি পাচ্ছে   সামাজিক উদ্বিগ্নতা  

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে .১৪১৩জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো.৬৩২জন৷ অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী৷ এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০জন নারী।নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ৷ ২০১৯ সালে যৌন হয়ানারীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন৷২০১৯ যৌন হয়রানীর শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন৷ প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন৷ যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷গত বছর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬৭ জন নারী৷ তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন তিনজন৷ আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী।

প্রতিনিয়ত ই ঘটে চলা এসব ধর্ষণের সমাজিক-জীববিজ্ঞানগত তত্ত্ব ছাড়াও মুল্যবোধের অবক্ষয়,নীতিনৈতিকতা বোধের অভাব, প্রশাসনিক দূর্বলতা, মামলার দীর্ঘসুত্রিতা, আইনের কার্যকারিতার অভাব,ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারণে বেড়েই চলছে ধর্ষনের মত ঘৃণিত কাজ।

বিগত ১০০ দিনে ৩৯২ জন নারী এবং শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে এই রাষ্ট্র ক’জন ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে? আর ধর্ষণের এই দায়ভার কি শুধুই ধর্ষকের? টাকার জন্য রিপোর্টে গড়িমসি করা প্রশাসনের কি দায়ভার নাই? নগদ বা মোটা অঙ্কের লোভে আদালতে দাড়িয়ে ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে আইনি লড়াই করা সেই নির্লজ্জ, বেহায়া, আইনজীবীর কি দায় নেই? দীর্ঘসূত্রিতায় জরাগ্রস্ত বিচার ব্যবস্থার কি দায়ভার নাই? ধর্ষকের এতগুলো সহযোগীকে মোকাবেলা করতে অপারগ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমি তবুও ধর্ষকের বিপক্ষে লিখছি এই আশায়, এই সমাজ একদিন জাগবে, ধর্ষকের তাৎক্ষণিক শাস্তি হবে। সেদিন তনু আর আমার ধর্ষিতা বোনদের আত্মা শান্তি পাবে।

একটা বিষয় ভাবুন, একজন ধর্ষকের বিচারের দাবিতে যখন পথঘাট তোলপাড়, তখন রাষ্ট্রের একার পক্ষ থেকে গৃহীত ব্যবস্থা কী!

ব্যভিচার বা ধর্ষণ ইসলামেও সুস্পষ্ট হারাম এবং জঘন্য অপরাধ বলে বিবেচিত।আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর: ২)

মামলার দীর্ঘসূত্রিতা প্রত্যাহার, দ্রুত শাস্তির কার্যকারিতা, আলাদা বিচার বিভাগের ব্যবস্থা(যেখানে শুধু ধর্ষকের শাস্তি এ নিশ্চিত করা হবে), আপিল আবেদনের সুযোগ না থাকা, শাস্তি,  পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বশীলতা বাড়ানো, নারীদের প্রতি রক্ষনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাহার, যেকোন ধরনের নিপীড়নের প্রতিবাদ করা,ধর্ষিতা নয় বরং ধর্ষিতার ছবি ভাইরাল(১৪ ধারার ১নং এবং ২নং উপধারায় বলা আছে যে উক্ত অপরাধে শিকার হয়েছেন এমন কোন নারী বা শিশুর সংবাদ এমননভাবে প্রকাশ পাবে যাতে তাদের পরিচয় প্রকাশ না পায় ২নং উপধারায় বলা আছে ১নং উপধারা লংঘিত করলে উক্ত লংঘনের জন্য দায়ী লোককে/লোকদের প্রত্যেককে ২বছর কারাদন্ড বা অনুর্ধ্ব ১লক্ষ টাকা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে), PBI এবং ইন্টেলিগেন্সী পুলিশকে দ্রত আলামত প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা, মুল্যবোধের চর্চা, এবং একই সাথে কঠোর আইন প্রয়োগ করে ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানের ওপর খেয়াল রাখতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, মসজিদের ইমাম ও খতীব এবং ওয়াজীনগনকে ইহকাল ও পরকালে ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে ওয়াজ নসিহত করতে হবে। 

অপরাধীকে বুক উঁচিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে দেখে ভিকটিমের কষ্ট আরও বাড়ে। অপরাধী শাস্তি পায় না বলে আরো অপরাধ করার স্পর্ধা ও সুযোগ পেয়ে যায়। তাকে দেখে অন্যরাও অপরাধ করতে উৎসাহিত হয় এবং অন্যরাও অপরাধ করে। এইভাবে সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ কলুষিত হচ্ছে। এদেশেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণের সেঞ্চুরি হয়। তারপরও ধর্ষক বুক ফুলিয়ে রাস্তা-ঘাটে নির্বিঘ্নে হেটে বেড়ায়।

আমরা এতটাই শিখরে উঠেছি যে  ধর্ষিতাদের চিৎকারে ধ্বনি আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। 

১৯৯১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকার প্রধান হিসাবে নারীরাই দায়িত্ব পালন করে আসছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। কিন্তু এতো কিছুর পরও আজ স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে এসেও আমাদেরকে ধর্ষণের বিচার চেয়ে রাস্তায় নামতে হয়। আমার প্রিয় জন্মভূমি ধর্ষক মুক্ত হোক। ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থায় আনার দাবি জানাই।                

লেখকঃ ফাতেমাতুজ জোহরা এলি, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়