আমার চেতনায় নারীবাদ ও কিছু কথা: নীলিমা সরকার

Spread the love

বারোহাত শাড়ির আবরণের অন্তরাল থেকেই বাঙালী নারী জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের মত উর্বর মস্তিষ্কের বহুল প্রতিভাময়ী লেখিকাগন। নারীর শিক্ষা,মুক্তি, পুরুষের সমান অধিকার সম্পর্কে সচেতনতামূলক কর্মকান্ডে তাঁরা পুরুষের মত পোশাক পরেননি বা পরতে বলেনওনি।নারী জাগরণের পথিকৃৎ সেই সব নারীগন কখনোই স্বামী / বাবা/ ভাই / বা পরিবারকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মত কোনো উদাহরণ ও দেননি। পিছিয়ে থাকা সেই সময়ের নারীদের শিক্ষা স্বাধীনতা অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে বিপ্লবী লেখাগুলি অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং এখনো রয়েছে।আফসোস শুধু এই যে নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার, নারী শিক্ষা বিপ্লবের তাৎপর্য কালের বিবর্তনে ভুল ব্যাখ্যায় গ্রহণ করেছে নারীদের এক বৃহদাংশ। আজকের স্বাধীনচেতা নারীদের একাংশ মহীয়সী সেই সব নারী জাগরণ বিপ্লবের কলম যোদ্ধাদের জীবনাদর্শ ভুলে কেবল শ্লোগানটুকু সম্বল করে ভুল ব্যাখ্যায় নিজেদেরকে, পরিবারকে, সমাজকে তথা সভ্যতাকে বিপথগামী করে চলেছে। 

নারী স্বাধীনতা মানেই সমাজ সভ্যতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেচ্ছাচারিতা নয়! সমঅধিকার মানেই পুরুষের সাথে যোগ্যতার প্রতিযোগিতা নয়! নারী শিক্ষা মানেই সমাজ সংসারে প্রচলিত সমস্ত রীতি নীতি উপেক্ষা করা নয়। নারী অধিকার মানেই কেবল পুরুষের প্রতিযোগী হতে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীর সার্টিফিকেটে ফাইল ভারী করা নয়! নারী স্বাবলম্বিতা মানেই নিজেকে টাকা বানানোর মেশিন বানিয়ে পুরুষকে নারী জীবনে অপ্রয়োজনীয় অধ্যায় ভাবা নয়! 

সম্প্রতি কোনো এক জার্নালে দেখলাম একজন (সম্ভবত) বাংলাদেশী নারী পুরুষের সংস্পর্শ ছাড়াই গর্ভধারণ করে গর্বিত হয়েছেন, এবং কথিত নারীবাদীগন তাতে বাহবা দিয়েছেন এবং তাদের গবেষনায় পুরুষ ছাড়াই গর্ভধারণ করাতে বিয়ে / পুরুষ ছাড়াই নারীর মা হতে পারাতে নারীবাদে এক ইতিবাচক মাত্রা যোগে আশার আলো দেখছেন।

আমার কথা হলো যে পদার্থ সংযোজনের মাধ্যমে নারী তুমি গর্ভধারণ করলে তা কি আকাশ ভেদ করে এসেছিলো? নাকি মাটি ভেদ করে উঠেছিলো? নাকি বাতাসে ভেসে এসেছিলো?আদতে তো পুরুষের কাছ থেকেই এসেছিলো তাই নয় কি? উপরোক্ত উল্লেখিত চিন্তাধারার নারীবাদ অনুসারীদের কখনোই আমি সভ্য সমাজের ধারক বাহক মনে করতে পারিনা। তবে গর্ভধারনের উপরোক্ত পন্থাকে অবশ্যই আমি আশির্বাদ মনে করি নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তানলাভের উপায় হিসেবে।প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর -‘নারী ” কাব্যেরবিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকরঅর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর।অংশখানির মর্মার্থে নারীর ক্ষমতা যোগ্যতা অবদান প্রকাশিত হয়েছে বাক্যবিন্যাশে । 

আমিও বিশ্বাস করি অবশ্যই নারীর অবদান অসামান্য এই বিশ্বের সমস্ত কল্যানকর সৃষ্ঠিতে।প্রান্তিক পর্যায়ের কাদামাটির শস্যক্ষেত হতে শুরু করে সুপ্রিমকোর্ট এর জজ কিংবা দেশের প্রেসিডেন্ট নিজ নিজ অবস্থানে তার কর্মকান্ডের শক্তি সাহস উদ্দিপণার নেপথ্যে যে যোগ্যতা যে অবদান রয়েছে তার প্রায় সবটুকুই নারীর।কখনো মা, কখনো স্ত্রী, আবার কখনো পারিবারিক সম্পর্কের অন্য নারী। যে ছেলেটি একশোভাগ সফলতার গর্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করলো, সেই ছেলেটির জন্ম থেকে শুরু করে তার প্রতিপালনে যে অজশ্র উপাদান প্রয়োজন হয়েছিলো তার প্রায় সবটুকুই নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে এসেছে ‘মা’ সম্পর্কিত নারীটি, যার অবদান ছাড়া উত্তম পুরুষ রুপে প্রকাশিত হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা ছিলোনা। দেশের সর্বচ্চো আদালতে বিচারকরের আসনে বসে কঠিন জটিল রায়গুলি দিয়ে যাচ্ছে যে বিচারক তিনিতো ঘর থেকে বের হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত যে ব্যাক্তিটির সেবা অনুপ্রেরণা পেয়েছে তিনি একজন নারী। 

অতএব এই বিশ্বের এমন কোনো মহান কাজ নেই যা নারীর অবদান ব্যাতিত সংঘটিত হয়েছে। নারী যে যেখানে যে অবস্থায় থাকুকনা কেন সেখান থেকেই তার অবদান রেখে যাচ্ছে। যে নারীটি বিশ্ববিদ্যালয় পার করেছে তার অবদান রয়েছে যেমন, যে নারী আক্ষরিক শিক্ষা না নিয়ে কেবল তিন বেলা উনুন জ্বালিয়ে পরিবারের খাবারের যোগান থেকে শুরু করে ঘরে সন্ধ্যা প্রদ্বিপ জ্বালানো,বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়ুয়া সন্তানের পাশে বসে ক্লান্ত ঘুমে ঢুলু ঢুলু নয়নে হাতপাখার বাতাস করে চলেছে তার অবদানও কম নয়। আমি মনে করিনা সমাজে দেশে বিশ্বে অবদান রাখতে গেলে কেবল নারীকে হুবুহু সেই সবই কাজ করতে হবে যা একজন পুরুষ করে থাকে। 

পুরুষের রোজগারের পয়সায় নারীর নির্ভরতাকে আমি কোনো লজ্জা বা হীনতা মনে করিনা, আমি মনে করি পুরুষের রোজগারে নারীর পুর্ন অধিকার! যদি আমার পুরুষ স্বামী আর সন্তান তিনবেলা আমার রান্না করা খাবার খেতে আমার যত্নয়াত্মিতে লজ্জা না পায় তবে আমি কেন তার রোজগার ভোগ করতে লজ্জা পাবো! 

আমি কিন্তু ঘর সংসারের কাজকে অফিস আদালতের কাজের চেয়ে সহজ মনে করিনা, অর্থনৈতিক মুল্য স্ত্রী না পেলেও ঘরের প্রতিটি কাজই আমি মূল্যাবান মনে করি যার মূল্যায়ন পয়সায় হয়না। এই শিক্ষা কোনো পাঠ্যবই বা কোনো ল্যাব দিতে পারেনা। কতটা সবজি বা মাছ মাংসে কতটা কোন মশলা দিতে হয় তাই কেবল জানলে হয়না, আবার এটাও জানতে হয় যে একটা মশলার পরিমানের সাথে আরেকটি মশলার পরিমান কেমন হওয়া উচিৎ।পাঁচটি সন্তানের জন্ম একই গর্ভ হতে হলেও পাঁচটির প্রকৃতি অনুযায়ী শিক্ষা শাসন বারনের ধরন ও কৌশল আলাদা হতে পারে, এরকম প্রতিটি কাজেই নারীর থাকে অসামান্য যোগ্যতা শিল্প কৌশল যা পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। লিখে তো শেষ করা যাবেনা! 

আধুনিক নারী অধিকারবাদীরা কেউ কেউ সংসারের কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নেই বলে অফিস, আদালত এর কাজকেই বেছে নিয়েছেন,নিজেকে আত্মনির্ভরশীল নারী ভেবে পরম সুখানুভব করছে বটে, আসলে সে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পরেছে কোনোনা কোনোভাবে কারো না কারো উপরে। নিজসন্তানের লালন পালন দেখভালের দায়িত্ব অন্য কোনো নারীর উপরে দেওয়া থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়ায় পর্যন্ত নির্ভর করতে হচ্ছে গৃহপরিচারিকার উপর অথবা আংশিক পুরুষের উপর। 

আমিও মনে করি নারী শিক্ষার প্রয়োজন ছিলো এবং আছে। আমি কেবল এটাই মানতে পারিনা যে নারী শিক্ষিত হবে কেবল টাকা রোজগারের জন্য, পুরুষের যোগ্যতার সাথে পাল্লা দিতে,আমি মানতে পারিনা ঘরের কাজগুলো অর্থনৈতিক সীকৃতি নেই বলে মমতায় জড়ানো সংসারের কাজগুলো অবজ্ঞা করবে, আমি মানতে পারিনা ধর্ম ও সমাজকে শাক্ষী করে যে পুরুষটি ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিলো তার রোজগারে নির্ভর করাতে নিজেকে ছোটো ভাবতে। আমি মানতে পারিনা নিজ সন্তানের লালন পালনে অন্যের উপর নির্ভর করতে। 

তবে আমি এটা স্বীকার করি যে পরিস্থিতি যদি বলে নারীর অর্থ উপার্জন করা জরুরী তবে নিশ্চয় নারীর সেটা কর্তব্য হয়ে যায়। আমরা নারীরা যতই নারীত্বকে অস্বীকার করতে চাইনা কেন কখনোই সেটা সম্ভব নয়, কেননা আমরা নিজেরা আচরণে কর্মকান্ডে, স্বাধীনতায় পোশাকে পুরুষের মতন করে গড়তে চাওয়ার চেষ্টা করলেও অবশ্যই পুরুষকে হাতে চুড়ি পরনে শাড়ী পড়া দেখতে কিংবা পয়সা উপার্জন না করে রান্নাঘরের কাজে দেখতে চাইবোনা। 

প্রতিটি মেয়েরই পড়াশোনা জানার প্রয়োজন আছে সংসারকে সুন্দর সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য, সন্তানকে সঠিক ভাবে মানুষ করার জন্য সামাজিক মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করার জন্য, এবং কি প্রয়োজনে যাতে পরিবারে অর্থ যোগানে চাকুরী কিংবা ব্যাবসা করতে পারে সেজন্যে, নিশ্চয় পুরুষের প্রতিযোগী হওয়ার জন্য নয়।বিকৃত নারীবাদ মেয়েদের অনেক বেশি পরাধীন করে ফেলেছে, বড্ড বেশি সেচ্ছাচারী করে তুলেছে, বিয়ে বা সংসার এর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে নিকৃষ্ট অপরাধে জরিয়ে পরছে, পুরুষকে অপ্রয়োজনীয় অংশ ভেবে অসম বিকৃত সম্পর্ক চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠছে। সভ্যতা পিছিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। বাঙালীর বাঙালীয়ানা মুছে যাচ্ছে চিন্তা চেতনা বসনে ভূষনে আচরণে। 

বিকৃত আধুনিকতার চর্চায় সপ্তাহে সপ্তাহে প্রেমিক প্রেমিকা পাল্টাতে বিবেক সমাজ ধর্মে আর বাধেনা, সামান্য কারণে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করাটা,যে কোনো বয়সে আরেকটা বিয়ে করাটাও নারী অধিকার ও স্বাধীনতার একটা উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন।আসুন আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের আধুনীকতা,আমাদের অধিকার, আমাদের শিক্ষা, আমাদের মুক্তি সুস্থ সভ্যতা লালনের মধ্য দিয়ে সামাজিক ধর্মীয় রীতি নীতি অক্ষত রেখে অর্জন করার চেষ্টা করি।

(বিধাতা নারী পুরুষকে ভিন্ন রুপে যেমন তৈরি করেছেন তেমনি ভিন্ন দায়িত্ব ও দিয়েছেন, তবে নারী পুরুষ একে অপরের পরিপুরক, একজনকে ছাড়া আরেকজনের চলেনা)

লেখক নীলিমা সরকার