বাংলাদেশের শিপ ব্রেকিং শিল্প, সমস্যা ও সম্ভাবনা

Spread the love

ফিরে দেখা: বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং শিল্প যেভাবে শুরু:

১৯৬০ সালের প্রলংকরী ঘূর্ণীঝড়ের কবলে পড়ে গঠ অষঢ়রহব নামের একটি শিপ সীতাকুন্ড থানার ভাটিয়ারী এলাকার বঙ্গোপসাগর উপকূলে আটকে যায়। শিপটি পুনরায় সাগরে ভাসানো সম্ভব হয়নি। এজন্য শিপটি কেটে ফেলা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত  পাকিস্তানী জাহাজ MV Al-Abbas কে ডুবন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট উপকূলীয় এলাকায় এনে কেটে ফেলা হয়। ১৯৭৬ সালে প্রবল জোয়ারে চট্টগ্রাম পোর্টের বহির্নোঙর থেকে ছুটে এসে সীতাকুন্ডের কুমিরা এলাকার বঙ্গোপসাগর উপকূলে আটকে যায় MV SS Earsion নামের একটি জাহাজ। এ জাহাজটিও আর সাগরে ভাসানো সম্ভব হয়নি। MV SS Earsion কিনে নেন বিদেশী ব্যবসায়ী মোঃ ইসমাইল, সালেহ ফখরী এবং বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সাবেক এমপি এমএ জিন্নাহ। কিনে নিয়ে তারা MV SS Earsion কে স্ক্র্যাপ হিসেবে কাটা শুরু করেন ১৯৭৭ সালে। এ শিপটি কাটতে ৪বছর সময় লাগে। মূলত MV SS Earsion কাটা সম্পন্ন হবার পর থেকেই বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভাবে ডশপ ব্রেকিং শিল্পের সূচনা হয়। ১৯৮২ সালের পর ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা উপকূল পর্যন্ত ৮৪টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠে।

বিশ্বে ডশপ ব্রেকিং শিল্পের সূচনা:

সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বেশির ভাগই ৯৫% মাইন্ড স্টীল দিয়ে তৈরী করা হয়। ২% স্টেনলেস স্টীল ও ৩% অন্যান্য ধাতবের মিশ্রণ থাকে। একটি জাহাজের চলাচল যোগ্যতা ২০বছর। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৫বছর পর্যন্ত চালানো যায়। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) একটি সমুদ্রগামী জাহাজের সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করেছে ২৯বছর। লয়েডস্ শিপিং রেজিস্ট্রার এর হিসাব মতে সারা দুনিয়ায় ৫০হাজার সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে। গড় পড়তা ২৯বছর বয়স শেষে প্রতি বছর ৭০০জাহাজ অচল হয়ে যায়। এসব অচল ডশপ ব্রেকিংর প্রক্রিয়ায় চলে আসে। উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিত ইউরোপ ও আমেরিকাতেই প্রথম ডশপ ব্রেকিং বা শিপ ব্রেকিং শিল্পের উৎপত্তি হয়। চল্লিশের দশকে প্রথম ডশপ ব্রেকিং শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইটালি, পর্তুগাল ও মেক্সিকোতে। এসব দেশে ৭০দশক পর্যন্ত ডশপ ব্রেকিং কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। প্রধানত শ্রমের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এসব দেশ এ শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পর্যায়ক্রমে তা গুটিয়ে ফেলা হয়।

চায়না: 

৭০দশকের শুরুতে শিপ ব্রেকিং কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয় এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার পাশাপাশি চায়নাতেও ডশপ ব্রেকিং শিল্পের প্রসার ঘটে। চায়নার শিপ ইয়ার্ডগুলো গেংডং প্রদেশের পানেয়ু শহরে অবস্থিত। তবে সরকারের পরিবেশ সচেতনতার কারণে বর্তমানে চায়নার শিপ ইয়ার্ডগুলো আগের মত চাঙ্গা নেই। চায়নাতে শিপ কাটা হয় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বা ড্রাই ডকিং করে। ২০০০ সালে প্রিনপিস চায়নার শিপ ইয়ার্ডগুলো পরিদর্শন করে এবং লক্ষ্য করে, চায়নাতে শ্রমিকদের ধাতু দুষণ, টক্সিক দুষণ প্রতিরোধ ক্ষমতা তেমন উন্নত নয়। এক গবেষণায় লক্ষ্য করা গেছে, পার্ল ও এয়াংটজ নদী পুরাতন জাহাজের পরিত্যক্ত বর্জ্যরে কারণে মারাত্মক দূষিত। এশিয়ার অন্যান্য দেশের শিপ ইয়ার্ড শ্রমিকদের মতো চায়নাতেও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা খুবই আশংকাজনক। এছাড়াও এজবেস্ট, তৈল, টিবিটি ইত্যাদি ভালো ভাবে পরিশোধন করা হয় না। চায়নার শিপ ইয়ার্ডগুলোতেও শ্রমিকদের বেতনের পরিমাণ কম। প্রতিমাসে ১জন শ্রমিক সর্বনিম্ন ৩৩ থেকে সর্বোচ্চ ৭৮ ইউএস ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বেতন পায়। গ্যাস বিস্ফোরণ, চাপা পড়ে অথবা ওপর থেকে পড়ে গিয়ে শ্রমিকরা দূর্ঘটনায় পতিত হয়। বর্তমানে চায়নার অধিকাংশ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নিস্ক্রিয়। তবে সা¤প্রতিককালে চায়না পুরোদমে শিপ ব্রেকিং কার্যক্রম শুরু করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।

ইন্ডিয়া:

ইন্ডিয়ার শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো বর্তমানে গুজরাট রাজ্যের এলাং নামের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। ১৯৮০ সালের আগে ইন্ডিয়ার ডশপ ব্রেকিং শিল্প মূলত ছোট এবং ধ্বংস প্রাপ্ত জাহাজ কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। এ শিল্প তখন ছিল বোম্বের দারখানায়। ৭০দশকের শেষের দিকে এ খাতে অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৭৮ সালে ইন্ডিয়ান সরকার এ খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে। ইন্ডিয়ান সরকারের দি মেটাল স্ক্র্যাপ ট্রেড কর্পোরেশন (এমএসটিসি) বিদেশ থেকে স্ক্র্যাপ ডশপ ব্রেকিংর জন্য আমদানীর দায়িত্ব এবং সরকার শিপ ব্রেকিং উন্নয়ন তহবিল গঠন করে। ১৯৮১ সালে সরকার শিপ ব্রেকিং  এর জন্য একটি উপযোগী স্ত ’ান খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সমুদ্র ঢেউ এর ঘনত্ব, সৈকতের বিশালতার কারণে গুজরাট রাজ্যের এলাং উপকূলীয় এলাকাকে সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে এলাং উপকূলীয় এলাকায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙ্গার জন্য আমদানী করা হয় MV Qouta Tonejong নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ। ১৮৩টি প্লট এবং ১৫কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তÍৃত এলাং এবং সোসিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিপ ব্রেকিং এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে বিশ্বে ডশপ ব্রেকিং শিল্পে ইন্ডিয়ার অবস্থান প্রথম বলে ধারণা করা হয়। ইন্ডিয়া সরকার গুজরাট মেরিটাইম বোর্ড (জিএমবি) নামের একটি পরিষদ গঠন করেছে। এ পরিষদ ডশপ ব্রেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ বোর্ডকে দুটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একটি হলো: শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এর জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শ্রমিকদের জন্য আবাসন। অন্যটি হলো: গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন স্থাপন। ১৯৯০ সালের আগে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানীতে জিএমবি’র প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তখন বোর্ড নিজেই জাহাজ আমদানী করে শিপ ব্রেকারদের কাছে বিক্রি করতো। ৯০ সালের পর জিএমবি জাহাজ আমদানীতে প্রত্যক্ষ দায়িত্ব পালন করে না। এখন শিপ ব্রেকাররা নিজেরাই বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে জাহাজ ক্রয় করে। ২০০৩ সালের শেষের দিকে ইন্ডিয়ায় শ্রমিকদের জন্য একটি ট্রেনিং এবং ওয়েলফেয়ার সেন্টার গঠন করা হয়েছে। এখানে শ্রমিকদের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কাজের ঝুকি এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এ ট্রেনিং সেন্টারে ৩ধরনের ট্রেনিং দেয়া হয়। এ সকল ট্রেনিং- এর মাধ্যমে শ্রমিকরা পূর্ব সতর্কতা পায়। ইন্ডিয়ার প্রায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের জীবন বীমা করা আছে। এর ফলে যেকোনো দুর্ঘটনা আহত বা নিহত হলে তারা ভাল পরিমাণ ক্ষতিপুরণ পায়। শ্রমিক আহত হলে শিপ ইয়ার্ড মালিক তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করে। নিহত হলে শ্রমিকদের পরিবারকে ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়। ইন্ডিয়ার শিপ ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের হেলমেট, বুট, মোটা কাপড়, চশমা ব্যবহারের নিয়ম আছে। দেশটির সুপ্রীম কোর্ট শিপ ইয়ার্ডে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশের জন্য একটি রুল জারি করেছে। এলাং এলাকায় শ্রমিকদের জন্য হেলথ্ কার্ড এর ব্যবস্থা রয়েছে। এটার মাধ্যমে শ্রমিকরা সহজেই স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারে। জানা যায় এলাং শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শুধু যাত্রীবাহী ও কার্গো শিপ ভাঙ্গার জন্য আমদানী করা হয়।

পাকিস্তান:

শিপ ব্রেকিং শিল্পের জন্য বর্তমানে পাকিস্তান ৪র্থ স্থানে রয়েছে। আরব সাগরের উপকূলবর্তী পাকিস্তানের গাদানী এলাকায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো অবস্থিত। পাকিস্তানের শিপ ইয়ার্ডগুলোর পরিস্থিতিও পরিবেশ বাংলাদেশের মত ছিল। বর্তমানে সে দেশের শিপ ইয়ার্ডগুলোকে আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছে। পাকিস্তানের শিপ ইয়ার্ডগুলোতে বড় বড় ট্যাঙ্কার শিপ কাটা হয়। গাদানীতে অবস্থিত শিপ ইর্য়াডগুলো বড় বড় ট্যাঙ্কারশিপ কাটায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান শিপ ব্রেকিং শিল্পে বিশ্বের ৩য় স্থানে ছিল। বর্তমানে দেশটি ৪র্থ স্থানে চলে গেছে।

টার্কি:

টার্কি বর্তমানে ডশপ ব্রেকিং শিল্পে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে টার্কির এলিজা নামের স্থানে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো অবস্থিত। OECD দেশ হওয়া সত্বেও টার্কির শিপ ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের অবস্থা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতোই। টার্কির এলিজাতে শিপ ব্রেকিং শুরু হয় ৭০ দশকে। শিপ ব্রেকিংর সরকারি অনুমোদন দেয়া হয় ১৯৮৪ সালে। টার্কি সরকার কোনোরকম নোংরা জাহাজ আমদানী করতে দেয় না (গ্রিনপিস ২০০০)। কিছু তফাৎ থাকলেও বিশ্বের ডশপ ব্রেকিং শিল্পের একটি মিল আছে। তা হলো: এ শিল্প থেকে দেশগুলো লৌহ তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়। সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হলো ডশপ ব্রেকিং শিল্পের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া এবং শিপ ইয়ার্ডগুলোতে সার্বিক মানবাধিকার লংঘন। এ সমস্যগুলো বিশ্বের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক দেশে বিরাজমান। চায়না, টার্কি ও ইন্ডিয়ায় শিপ ইয়ার্ড উন্নয়নে এবং সার্বিক পরিচালনায় সরকারের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। শিপ ব্রেকিং-এর জন্য নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। এরপরও গ্যাস বিস্ফোরণ জনিত কারণে শ্রমিক হতাহত হওয়া, শ্রমিক অধিকার লংঘন, দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব এ শিল্পের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

শিপ ব্রেকিং শিল্প বিকাশে ইউএনডিপির প্রকল্প:

বাংলাদেশ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইউএনডিপি’র অর্থায়নে ও আইএলও’র সহযোগিতায় শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। প্রকল্পটির নাম ÒSafe and Environment Eriendly Ship Recycling Project”। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে আজ পর্যন্ত এ প্রকল্পের কোনোরকম প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে শিপ ইয়ার্ড:

২০০৪ সালে কুমিরা খালের উপর একটি রেগুলেটর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবার পর কুমিরা খালের উত্তর পাশে বিবিসি স্টীল নামের একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন আবুল কাশেম রাজা নামের এক ব্যবসায়ী। এ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে ওঠার পর কুমিরা খালের উত্তর দিকে একের পর এক শিপ ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। বর্তমানে এখানে ৩০টির মতো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। ৬০এর দশক থেকে শুরু হয়ে ৯০দশক পর্যন্ত ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত ৮৪টি শিপ ইয়ার্ড গড়ে উঠেছিল। উপকূলে চর জেগে ওঠার কারণে ফৌজদারহাট ও তুলাতলিতে গড়ে তোলা শিপ ইয়ার্ডগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভাটিয়ারী থেকে বাঁশবাড়িয়া উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত শিপ ইয়ার্ডের সংখ্যা ৮০টি। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং এসোসিয়েশন (বিএসবিএ) ডশপ ব্রেকিং ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিএসবিএ সূত্র জানায় বর্তমানে তাদের সদস্য সংখ্যা ১৬০জন। শিপ ইয়ার্ডের সংখ্যা ৮০টি। শিপ ইয়ার্ডের চেয়ে সদস্য সংখ্যা বেশি কেন এ প্রশ্নের জবাবে বিএসবিএ সূত্র জানায় এক ইয়ার্ডে একাধিক সদস্য রয়েছে।

বিলেট ও রি-রোলিং মিল:

বাংলাদেশে এখনও আকরিক লোহার খনি আবিস্কৃত হয়নি। উন্নয়ন কর্মকান্ডের যাবতীয় লৌহ সামগ্রীর জন্য শিপ ব্রেকিং সেক্টরের ওপর নির্ভর করতে হয়। জানা যায় বর্তমানে দেশে ২০থেকে ২২লাখ টন লৌহ সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগ (১৫থেকে ২০লাখ টন) যোগান দেয়া হয় শিপ ব্রেকিং সেক্টর থেকে। শিপ ব্রেকিং সেক্টর না থাকলে বিলেট ও স্টীল ইনগট আমদানী খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে চলে যেতো। বর্তমানে দেশে ৫শর মতো রি-রোলিং মিলস্ রয়েছে। এসব রোলিং মিলস্ এর সমূদয় কাঁচামাল শিপ ব্রেকিং সেক্টর থেকেই সরবরাহ করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে ২০০৩ সালে বুয়েট ও চুয়েট পুরনো জাহাজের শীট দিয়ে রি-রোলিং মিলস্ এ উৎপাদিত এমএস রডের অংশ পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষায় পুরনো জাহাজের তৈরি সামগ্রী এবং এমএস রড উচ্চগুণগত মানসম্মত বলে প্রমাণিত হয়।

রাজস্ব আয়:

শিপ ব্রেকিং শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। দক্ষ-অদক্ষ মিলে ২থেকে আড়াই লাখ লোকের কর্মসংস্থান করেছে এ খাত। এ খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রত্যক্ষ ভাবে ২০লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত হিসাব জানা না গেলেও প্রতি বছর ৬০০কোটি থেকে ৮০০কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয় বলে ধারণা করা হয়। বিএসবিএ সূত্রে জানা যায় ২০০৪ সালে ডশপ ব্রেকিং শিল্প থেকে সরকার ৬০০কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ১হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। শিপ ব্রেকিং সেক্টর থেকে তামা ও পিতল রপ্তানী করে প্রতি বছর ১শ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ।

শিপ ব্রেকিং শিল্পের রোড সমস্যা:

কুমিরা খালের উত্তর দিকে গড়ে উঠা শিপ ইয়ার্ডগুলোর এপ্রোচ রোড মাত্র ১টি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরা বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকে কুমিরা উপকূলে স›দ্বীপ স্টীমার ঘাট রোডটি ১লেন বিশিষ্ট। এ রোডটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের। কুমিরার উত্তর দিকে গড়ে উঠা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো এ রোডটি ব্যবহার করছে। এ জন্য ১লেন বিশিষ্ট রোডটির ওপর মারাত্মক চাপ পড়েছে। উভয় পাশে স¤প্রসারণ করে এ রোডটিকে ২লেনে উন্নীত করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা না হলে অত্যাধিক চাপে রোডটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে যাবে।

বেড়িবাঁধ:

পাকিস্তান আমলে নির্মিত বেড়িবাঁধটি ভেঙ্গে যাওয়ায় ১৯৯২ সালে বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা পর্যন্ত নতুন আরেকটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০০৪ সালে কুমিরা থেকে সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বার আউলিয়া পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। কুমিরা রেগুলেটরের উত্তর দিকে নির্মিত বেড়িবাঁধ ব্যবহার করছে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা। বেড়িবাঁধের ওপর শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ভারি মোটরযান চলাচল করছে। কারণ কুমিরার উত্তর দিকে গড়ে উঠা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর মালামালবাহী মোটর গাড়ী চলাচল করার জন্য কোনো এপ্রোচ রোড নেই। এ জন্য কুমিরা সন্দ্বীপ স্টীমার ঘাট রোড, কুমিরা রেগুলেটর ও বেড়িবাঁধকে সড়ক রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেষে একটি রোড নির্মাণ করা হয়েছে। ফৌজদারহাট থেকে সীতাকুন্ড পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধটি বহুমুখি ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব। বিদ্যমান বেড়িবাঁধকে আরো উঁচু করে চার লেন বিশিষ্ট রোড নির্মাণ করা হলে এটাকে বহুমুখি ব্যবহার করা যাবে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড-এর মালামাল আনা নেয়া সহজ হবে। রোডটি বাস্তবায়ন হলে সীতাকুন্ড উপকূলীয় এলাকা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্য এলাকাটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

শিপ ব্রেকিং শিল্পের সমস্যা:

বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং শিল্পের সূচনার পর থেকে এ পর্যন্ত ১হাজারের বেশি শ্রমিক বিভিন্ন দূর্ঘটনায় মারা গেছে। শিপ কাটার সময় আগুন লেগে, প্লেট চাপা পড়ে এবং গ্যাস বিস্ফোরণে উল্লেখিত পরিমাণ শ্রমিক মারা যায়। পেট্রোলিয়াম আইন ১৯৩৭-এর ৩৮ধারা অনুযায়ী শিপ বিচিং করার আগে বহির্নোঙরে এবং বিচিং করার পর কাটার আগে গ্যাস মুক্তকরণ সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক। এ ব্যাপারে সনদ দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। গ্যাস মুক্ত না করে শিপ কাটা শুরু করার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিস্ফোরণে শ্রমিক মারা যায়। ফৌজদারহাট, ভাটিয়ারী ও কুমিরা উপকূলে যখন ডশপ ব্রেকিং শিল্পের সূচনা হয় তখন একটি শিপ কাটতে ৪-৫বছর সময় লেগে যেতো। MV Alpine, MV Al-Abbas ও MV SS Earsion কাটতে এরকম সময় লেগেছে। এখন শিপ কাটতে লাগছে ৪-৬মাস। অর্থাৎ শ্রমিকরা নিজ চেষ্টায় দক্ষ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য ডশপ ব্রেকিং শিল্পের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। বেশির ভাগ শিপ ইয়ার্ডে ভারি লোহার প্লেট কাঁধে বহন করে শ্রমিকরা। দু-একটা ইয়ার্ডে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, ইকুইপমেন্টস ব্যবহার করা হচ্ছে। শিপ ব্রেকিং খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ১হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়।  অথচ এ খাত উন্নয়ন-আধুনিকায়নে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। শ্রমিক মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার জন্য একটি শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার। শিপ ব্রেকিং শিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করার জন্য ইয়ার্ডগুলোতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও ইকুইপমেন্টস সংযোজন করা দরকার।

লাইসেন্স প্রথা:

শিপ ব্রেকিং শিল্পের লাইসেন্স প্রথা চালু করা হয় ১৯৮২ সালের পর থেকে। একসনা ভূমি ব্যবহার অনুমোদন মূল্য প্রথমে নির্ধারণ করা হয় প্রতি একর ভূমি ১০০০/- টাকা। পরবর্তীতে নির্ধারণ করা হয় ৪০০০/- টাকা। ১৯৮৬ সাল থেকে ৬০০০/- টাকা নির্ধারণ করা হয়। সীতাকুন্ড ভূমি অফিস থেকে জানানো হয় যে, বর্তমানে এক সনা অনুমোদন চার্জ একর প্রতি ১২০০০/- টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে যেসব এলাকায় শিপ বিচিং হচ্ছে সেসব এলাকা এক সময় ছিল কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। মূলত বিদেশ থেকে শিপ আমদানী করে বিচ করার জায়গাগুলোর ব্যবহার অনুমোদন দেয়া হচ্ছে ১ সনা মেয়াদের। সরকার কর্তৃক ব্যবহার অনুমোদন দেয়া জায়গাগুলো আরএস, পিএস রেকর্ডভূক্ত। কিছুকিছু বিএস রেকর্ডভূক্ত জায়গাও রয়েছে। ১সনা অনুমোদনের জন্য সরকার নির্ধারিত একর প্রতি ১২,০০০/- টাকার বাইরেও লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে জানা যায়। ২০০৮ সালের পর বেশ কয়েকটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড দখল-বেদখলের ঘটনা সংবাদপত্রে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় বেশ ক’জন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, পেশাদার সন্ত্রাসী শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড দখল-বেদখলের ঘটনায় জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। ২০০৭ সালের পর কুমিরার উত্তর দিকে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠার পর দখল-বেদখল, জায়গা জাল-জালিয়াতির ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে আম-মোক্তারনামা সম্পাদন করে একজনের জায়গা অন্যজনের নামে বিক্রি করার ঘটনা ঘটছে অহরহ। ভূমি অফিসের কতিপয় দূর্নীতিবাজ কর্মচারী, ভূমি জালিয়াত চক্র ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড অধ্যুষিত এলাকায় একটি শক্তিশালী ভূমিদস্যু ও ভূমি প্রতারক চক্র গড়ে উঠেছে। এদের অশুভ প্রভাবে প্রকৃত ভূমির মালিকরা অসহায় হয়ে পড়েছে।

নির্মাণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানীর পাঁয়তারা:

আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ছাড়াও চায়না, পাকিস্তান, টার্কি ও ইন্ডিয়ায় শিপ ব্রেকিং শিল্প বিদ্যমান রয়েছে। সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় শিপ ব্রেকিং শিল্পে বাংলাদেশ একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছে গেছে। দেশের নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত রড ও লৌহ সামগ্রীর একমাত্র উৎস শিপ ব্রেকিং শিল্পের কাঁচামাল। দেশের ৫শতাধিক রি-রোলিং মিলের কাঁচামাল সরবরাহ করা হয় এ শিল্প থেকে। কিছুদিন যাবৎ নির্মাণ শিল্প ও রি-রোলিং মিলের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানীর জন্য একটি চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। এরাই শিপ ব্রেকিং শিল্পের বিরুদ্ধে জোরালো অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

লেখক পরিচিতি:

সাইয়েদ ইকরাম শাফী, তরুণ লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, মোবাইল: ০১৮১৯-৯৪২৩১৩, E-mail: s.iquram03@gmail.com