মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সঙ্গে কারা!

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: ডাকসু ভবনে গত রোববার হামলার নেতৃত্ব দেওয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে’র দায়িত্ব এখন কেউই নিতে চাইছে না। সবাই এখন এই সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের সংশ্নিষ্টতা পাশ কাটাতে চাইছে। কারা এই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ চালাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশিষ্টজন বলছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের নাম নিয়ে যারা এ ধরনের হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেউ হতে পারে না। এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তারা। এ হামলার ব্যাপারে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অবস্থানও দাবি করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ গঠিত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন শুরু করার পর তা পরিচালনার জন্যই ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ গঠন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক ও আসিবুর রহমান খানকে সদস্য সচিব করে এ সংগঠনের প্রথম কমিটি গঠিত হয়। আসিবুর রহমান খান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খানের ছেলে। চলতি বছরের মার্চ মাসে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতা আমিনুল ইসলামকে সভাপতি ও আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করা হয়।

গত রোববার ডাকসু ভবনে ভিপি নুর ও তার সমর্থকদের ওপর যে নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে, তার নেতৃত্বে আমিনুল ইসলাম ছিলেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সমকালকে জানান। তারা জানান, আমিনুলের নেতৃত্বে তার  সমর্থকরা প্রথমে হামলা শুরু করে। পরে সূর্য সেন হলের ভিপি সোহান এবং জিএস সিয়াম হামলায় অংশ নিয়ে ভিপি নুর ও তার সমর্থকদের বেপরোয়া মারধর করেন। ঘটনার সময় সেখানে ডাকসুর নির্বাচিত এজিএস সাদ্দাম হোসাইন ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস উপস্থিত ছিলেন। সনজিত ও সাদ্দাম দু’জনেই হামলাকারীদের উৎসাহিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলা শেষ হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর ডাকসুর জিএস এবং দুর্নীতির দায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অপসারিত গোলাম রাব্বানী ডাকসু চত্বরে আসেন। ওই সময় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় তিনি বলছেন, ‘ভিপি নুর নিহত নাকি আহত হয়েছেন, ডাজ নট ম্যাটার। তাকে আর ডাকসুতে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’ যদিও পরবর্তী সময়ে এ বক্তব্য তিনি দেননি বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন। ভিপি নুরের একাধিক সমর্থকের দাবি- ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’কে ব্যবহার করে পুরো ঘটনার নেপথ্যে থেকে মদদ দিচ্ছেন গোলাম রাব্বানী।

এ ব্যাপারে সমকালের পক্ষ থেকে জানতে গোলাম রাব্বানীকে ফোন করলে তিনি লিফটে আছেন জানিয়ে এক মিনিট পরেই ‘ফিরতি কল’ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। তবে পরে তিনি আর ফোন করেননি। তাকে ফোন করলেও ধরেননি। সোমবার এ সম্পর্কে অন্য একটি সংবাদমাধ্যমে গোলাম রাব্বানীর বক্তব্য প্রকাশিত হয়। ওই বক্তব্যে মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই অপপ্রচার চলছে। এ ধরনের অভিযোগ সেই অপপ্রচারেরই অংশ, এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। তিনি ডাকসুর নির্বাচিত জিএস, এটাই তার পরিচয়।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ গঠিত হয়েছে। আমিনুল ইসলাম ও আল মামুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে গত অক্টোবরে তাদের মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা এখন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেউ নন। তারা অন্যায়ভাবে এ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে হামলা, সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছেন। এর দায় কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানী জানান, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো রেজিস্টার্ড সংগঠন নয়। এ মঞ্চের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রোববার এবং তারও আগে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্ত চলছে। তদন্তের পর এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না’ :মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সমকালকে বলেন, ডাকসু একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। ভিপি নুর শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তার সঙ্গে কারও মতপার্থক্য থাকলে কিংবা তার কর্মকাণ্ড পছন্দ না হলে তার জবাব পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমেই দেওয়া যায়। এভাবে হামলার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় সন্ত্রাসের জায়গা নয়, যুক্তির জায়গা। এখানে মতপার্থক্য থাকলে তা নিয়ে বিতর্ক হবে, শারীরিক আক্রমণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত, এ হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে হামলা হয়েছে বলে শুনেছি। এ মঞ্চের সঙ্গে কারা আছেন, জানি না; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নাম নিয়ে যারা এ ধরনের সন্ত্রাস করতে পারে, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেউ হতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের হামলার ঘটনা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। অভিভাবক, শিক্ষকসহ কোনো সচেতন মানুষই এটা মেনে নিতে পারে না। তিনি বলেন, কোনো ব্যানারেই এ ধরনের হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত নিবিড় তদন্ত করে জড়িতদের খুঁজে বের করা এবং শাস্তি দেওয়া।

স্বাধীন বাংলাদেশে ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এমনভাবে সন্ত্রাস-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে যে তা এখন দেশের জন্য বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য ক্ষমতাসীন সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উভয়েই দায়ী।