দক্ষ কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: দক্ষ কর্মী তৈরিতে জোর দিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। করোনাকালের ক্ষতি কাটানোর উপায় প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশ পাঠানো। যারা দেশে ফেরত এসেছেন, তাদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসন কিংবা পুনরায় বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ সমকালকে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন।

করোনাকালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতের একটি জনশক্তি। সাত মাস ধরে বিদেশে কর্মী পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ। স্বাভাবিক সময়ে সাত মাসে চার থেকে সাড়ে চার লাখ কর্মী বিদেশ যান। ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন দুই থেকে আড়াই লাখ কর্মী। ফেরত এসেছেন দেড় লাখের মতো। সব প্রক্রিয়া শেষ করেও করোনার কারণে বিদেশ যেতে পারেননি সোয়া লাখ নতুন কর্মী। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর ভাষায়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির শিকার জনশক্তি খাত। কর্মী আসা ও যাওয়া দুই-ই বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেছেন, এ অবস্থা থেকে বেরোতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি আশাবাদী করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশি শ্রমবাজারে কর্মীর চাহিদা বাড়বে। বিশেষভাবে দক্ষ কর্মীর চাহিদা সৃষ্টি হবে। সেই চাহিদাকে কাজে লাগাতে প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিদেশগামী কর্মীদের ৬২ শতাংশ আধা দক্ষ কিংবা অদক্ষ। ৩৪ শতাংশকে দক্ষ বলা হলেও তারা কতটা প্রশিক্ষিত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দক্ষতার অভাবে বিদেশে ভালো কাজ পান না বাংলাদেশিরা। অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় কম বেতন পান। জনশক্তি খাতের মূল সমস্যা অদক্ষতা দূর করার বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরিকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ৭১টি নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। কোথায় কোথায় টিটিসি স্থাপন করা হবে, তা নির্ধারণে সব এমপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শুরুতে সাড়া না পেলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশ পাঠানোর আগে তিন দিনের ‘প্রাক-ভ্রমণ প্রশিক্ষণ’ নামে তামাশা থাকবে না। সত্যিকারের প্রশিক্ষণ দিতে চান। প্রশিক্ষণ মেয়াদ বাড়বে। যেখানে সত্যিকারের কাজ শেখানো হবে। কতদিন বাড়ানো যায়, তা দেখা হচ্ছে। যারা প্রশিক্ষণ নেবেন তাদের স্বীকৃতি সনদ দেবেন।

শুধু দেশে নয়, বিদেশে অবস্থানরত কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো কর্মী যদি ভিসার মেয়াদ থাকার পরও সৌদি আরবে বেকার হয়ে যান, তাহলে কর্মহীন সময়ে তাকে সেখানেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে তিনি নতুন একটি চাকরি পেতে পারেন। ইতোমধ্যে গ্রিসে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবারই রন্ধনশিল্পের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। বাহরাইনে ইতোমধ্যে এক হাজার বেকারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের খরচ মন্ত্রণালয় দেবে।
বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয় দেশ। এসব দেশের ভাষা আরবি। ইমরান আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশে এত মাদ্রাসা! কিন্তু আরবি ভাষা বলতে পারার মতো দক্ষ লোক নেই। এতে তার দুঃখ হয়, এত মাদ্রাসা কিন্তু কর্মীরা আরবি না জেনে মধ্যপ্রাচ্যে যান। মাদ্রাসাগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষিত করতে পারে আরবি ভাষা শিক্ষা দিয়ে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা রয়েছে আরবি ভাষা শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেওয়া হবে।

বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের শিকার হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তা বন্ধেও প্রশিক্ষণকে সমাধান মনে করছেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, মেয়েদের প্রশিক্ষণ বেশি জরুরি। মেয়েদের গ্রাম থেকে সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্যবস্থাটিই এমন দাঁড়িয়ে গেছে। এ অনিয়ম বন্ধ করা হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে হবে।

মন্ত্রী ইমরান আহমদ জানিয়েছেন, করোনাকালে দেশে ফেরত আসাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারা। যারা আট-দশ বছর বিদেশ থাকার পর ফিরেছেন তারা অদক্ষ হিসেবে গেলেও কাজ করতে করতে দক্ষ হয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের হয়তো দক্ষতার সনদ নেই। করোনার পর তারা আবার বিদেশ গেলে দক্ষতার স্বীকৃতি সনদ (আরপিএল) দেওয়া হবে। যাতে তারা ভালো কাজ পান। এ সনদের জন্য কর্মীদের কোনো ফি দিতে হবে না। যত কর্মী আরপিএলের জন্য আসবেন, মন্ত্রণালয় তাদের ফি পরিশোধ করবে।

করোনাকালে দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও তাদের জন্য গঠিত ২০০ কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও ঋণ পাননি প্রবাসীরা। মন্ত্রী বলেছেন, এতদিন পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ঋণ বিতরণে অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। জুলাই মাসে তহবিল গঠনের পর তিন মাসে এখন পর্যন্ত এক টাকা ঋণ দিতে না পারার অভিযোগ সত্য। আগামী সোমবার শুরু হবে। যারা পুনর্বাসনের ঋণের জন্য আবেদন করছেন, তারা পাবেন। ঋণের নিয়ম অনেক শিথিল করা হয়েছে। ঋণ নীতিমালা কঠিন ছিল, তা সহজ করা হয়েছে। সব সমস্যা দূর করা হয়েছে। প্রবাসীদের কল্যাণে যত ছাড় দেওয়া প্রয়োজন, দেওয়া হবে। প্রবাসীদের জন্য ২০০ কোটি টাকার প্যাকেজে আরও ২৫০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে আরও ২৫০ কোটি টাকা আসবে। আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ কোটি টাকার তহবিল যোগ হবে।

বাংলাদেশের ৯০ ভাগ কর্মীরই গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশ এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রায় এক যুগ ধরে বলছে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে খোঁজ চলছে। মন্ত্রণালয়ের বাজার অনুসন্ধানে উইং রয়েছে। দূতাবাসগুলোর শ্রম উইং থাকলেও নতুন বাজার সৃষ্টিতে ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়া ছেড়ে উন্নত দেশের শ্রমবাজারের দুয়ার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নতুন শ্রমবাজারে ছোট সংখ্যায় হলেও কর্মী যাচ্ছেন। আলবেনিয়াতে প্রথমবারের মতো বৈধভাবে কর্মী পাঠানো হয়েছে। পোল্যান্ড, রোমানিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কম্বোডিয়াতে কর্মী যাচ্ছেন। সেসেলস খুলেছে। এসব শ্রমবাজারে অল্প সংখ্যায় কর্মী গেলেও তারা সবাই ভালো আছেন। ভালো চাকরি করছেন। মন্ত্রী জানান, তাদের গুরুত্ব সংখ্যা নয়, তারা মানসম্মত অভিবাসনে জোর দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য যত কম সংখ্যক কর্মীই যান, যারা যাবেন তারা যেন ভালো থাকেন, নিপীড়িত না হন। ভালো চাকরি করে যেন ভালো বেতন পান।

মানব পাচার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো নিষিদ্ধ। ২০১৫ সালের পর একজনকেও লিবিয়ায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু লিবিয়ায় লোকজন যাচ্ছেন দালালের হাত ধরে। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাচ্ছেন। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধ হবে না। উৎসমুখ বন্ধ হলে মানব পাচার বন্ধ হবে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠাতে অনিয়ম করছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছে।