জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫.২৪%, মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ। স্থির মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বার্ষিক মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলার ছাড়িয়ে দুই হাজার ৬৪ ডলারে উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রাথমিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘করোনাকালের কঠিন সময়েও এ অর্জন আশাব্যঞ্জক’- এমন মন্তব্য করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সমকালকে জানান, প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি কম হলেও আশাহত নন তিনি। তার কারণ, গত অর্থবছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় তারা কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে ছিলেন। চলতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। মার্চ থেকে জুন- এ চার মাস প্রায় সব কিছুই বন্ধ ছিল। তারপরও পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে খুবই ভালো বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলার অতিক্রম করা খুশির খবর। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে গত অর্থবছর জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, বিশ্বমন্দার কারণে সব দেশেই প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পতন হয়েছে। অনেক দেশে ঋণাত্মক হয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন অবশ্যই ইতিবাচক।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে একটি ‘স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি’ হবে।তবে গবেষণা সংস্থা পিআরআইএর নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, করোনাকালে দেশের অর্থনীতির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে অনুযায়ী অর্জিত প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই প্রবৃদ্ধিকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন. প্রতিবেশী দেশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে কীভাবে এই প্রবৃদ্ধি হলো তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় দুই দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৪ ডলার। এর আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ছিল এক হাজার ৯০৯ ডলার। এ ছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৭৫১ ডলার; ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৬১০ ডলার।

বিবিএস বলেছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রাথমিক। আগামী দুই মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করা হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট দশমিক দুই শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ধাক্কায় সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। করোনায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সংশোধন করে পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ নির্ধারণ করে সরকার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে আট দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়- যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি সারাবিশ্বেই প্রশংসিত হয়েছে। করোনার প্রবল ধাক্কায় এ অর্জন ব্যাহত হলেও সরকার আশা করছে, চলতি অর্থবছরে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। এ জন্য চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে আট দশমিক দুই শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে সরকার। যদিও মহামারির সময় উচ্চাভিলাষী এই প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করায় বাজেট ঘোষণার পরপরই অর্থনীতিবিদরা সরকারের সমালোচনা করেন।

মহামারির ধাক্কায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও অনেক কম হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছিল, ‘২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই দশমিক পাঁচ শতাংশের বেশি হবে না। গত ৮ জুন প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস ২০২০’-এ বলা হয়েছিল, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক দশমিক ছয় শতাংশে নেমে আসতে পারে। গত ৩ জুন প্রকাশিত আইএমএফের কান্ট্রি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব হবে মারাত্মক। আর এর প্রভাবে প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক আট শতাংশে নেমে আসতে পারে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বলেছিল, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশের নিচে নেমে আসবে। কিন্তু সেটা ভুল প্রমাণ করে একটা সম্মানজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ।’ পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশও এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না বলে ধারণা করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির চৌধুরী বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে প্রবৃদ্ধি পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জন খুব খারাপ না। তিনি মনে করেন, অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরছে। রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি হবে।