শীতে কাঁপছে দেশ

Spread the love

দেশজুড়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ফলে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে গোটা দেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ঘন কুয়াশার কারণে সূর্য উঁকি দিতে পারেনি। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে গেছে। এতে পৌষের শুরুতেই নেমে এসেছে মাঘের শীত।

ঘরের বাইরে পা রাখতেই শীতে জমে যাচ্ছে মানুষ। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সকালে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

আগারগাঁওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, চুয়াডাঙ্গার পাশাপাশি রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও যশোর অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আজ শুক্রবার এটি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত। রোববার থেকে দিন ও রাতে তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, আগামী দু’দিন শীতের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। শৈত্যপ্রবাহের বিস্তার আরও কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে শনিবার পর্যন্ত। সারাদেশে রাতে তাপমাত্রা আরও একটু কমতে পারে।

প্রতি বছর রাজধানীতে সাধারণত শীতের আমেজ দেখা যায় অন্য এলাকার চেয়ে অনেকটা দেরিতে। ঢাকায় গত মঙ্গলবার পর্যন্ত শীতের তীব্রতা ছিল না। তবে বুধবার থেকে এখানে তাপমাত্রা কমতে থাকে। তাপমাত্রা কমার বিপরীতে শুরু হয় শীতল হাওয়া। সূর্য মুখ লুকায় কুয়াশার আড়ালে। গতকালও সূর্যের দেখা মেলেনি। এদিন সকাল ৯টায় ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, শীতবস্ত্রের বেচাকেনা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ফুটপাতে শীতের জামা, মোজা, টুপিসহ নানা সামগ্রী কিনতে ভিড় করছিলেন নিম্ন

আয়ের মানুষ। অভিজাত বিপণিবিতানেও শীতবস্ত্র বিক্রির ধুম পড়েছে।

তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা কম থাকলে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে ধরা হয়। থার্মোমিটারের পারদ ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে হলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। আর পারদ ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে রাজশাহী, ঈশ্বরদী, নওগাঁর বদলগাছী, রাজারহাট ও যশোরে।

জনজীবনে স্থবিরতা :রাজশাহী ব্যুরো জানায়, এ নগরীতে প্রতিদিনই কমছে

তাপমাত্রা। বৃহস্পতিবার ভোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্র ও শনিবার তাপমাত্রা আরও কমতে পারে বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক দেবল কুমার মৈত্র। গতকাল সকালে নগরীতে কিছুক্ষণের জন্য সূর্য উঁকি দিলেও হিমেল বাতাসে তাপ অনুভব হয়নি। কনকনে ঠান্ডায় ভোগান্তিতে পড়েছে ছিন্নমূল মানুষ, শিশু, বৃদ্ধ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতের কারণে তাদের নানা রকম রোগ-ব্যাধি দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গত মঙ্গলবার থেকে জেলায় শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ নামতে থাকে হাড় কাঁপানো শীত। বৃহস্পতিবার সূর্যের দেখা মেলেনি। দুপুর অবধি আকাশ ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। কনকনে ঠান্ডায় ঘর থেকে বাইরে বেরোতে পারছেন না মানুষ। ফলে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

সরাইলে গিয়ে দেখা যায়, ছিন্নমূল মানুষেরা খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। ঠান্ডায় কাবু মানুষেরা দৈনন্দিন কাজেও বের হতে পারছেন না। এদিকে, বিভিন্ন এলাকায় শীতার্তদের মাঝে সরকারি উদ্যোগে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। কয়েক দিন ধরে কনকনে শীতে পঞ্চগড়ের দুস্থ ও খেটে খাওয়া মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। তারা খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার কম্বলসহ শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, হিমেল হাওয়া এবং ঘন কুয়াশায় নোয়াখালীর জনজীবনে অচলাবস্থা নেমে এসেছে। চাটখিল, সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সদর, সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলার উপকূলবর্তী অঞ্চলে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। দিনের বেলায় কিছুটা উষ্ণতা থাকলেও রাতে কনকনে ঠান্ডা নেমে আসে। শীতার্তদের জন্য ৪৬ হাজার কম্বল বরাদ্দ করা হয়েছে। নোয়াখালী জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা হামিদুল হক বলেন, আরও কম্বল চেয়ে তিনি ইতোমধ্যে আবেদন করেছেন।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজারহাট কৃষি ও সিনপটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে। ফলে শীতের তীব্রতা বাড়ছে। আগামী কয়েকদিনে তাপমাত্রা আরও কমবে। এখানে সরকারের তরফ থেকে প্রায় ৫০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা খায়রুল আনাম।

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, গতকাল এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন জানান, এ সপ্তাহে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু ঈশ্বরদী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় মেঘনা উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কনকনে শীতের সঙ্গে হিমেল হাওয়া বইতে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চরকালকিনি, তালতলি, কাদিরপণ্ডিতের হাট, চরফলকন ও দক্ষিণ চরফলকনসহ উপজেলার মেঘনা তীরবর্তী এলাকার মানুষ। শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। তীব্র শীতের কারণে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের ঘরে ঘরে সর্দি, জ্বর ও নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব রোগে শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি জানান, কনকনে ঠান্ডায় সুন্দরগঞ্জের জনজীবনে অচলাবস্থা নেমে এসেছে। বিশেষ করে তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষ শীতে কাবু হয়ে গেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলী জানান, ইতোমধ্যে দরিদ্র মানুষের মাঝে প্রায় ১০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।