নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা পেলে একসঙ্গে ফিরব

কুতুপালং থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির কক্সবাজারের কুতুপালং। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা এখন অবস্থান করছেন এখানে। উখিয়া বাজার পার হলেই এ রোহিঙ্গা শিবিরের প্রবেশপথ। এখান থেকে পাহাড়ের গা-ঘেঁষে প্রায় সাত কিলোমিটার পার হলেই একটি মাঠ। অনেকটা মরুভূমির মতো এই মাঠের চারপাশে পাহাড়। একদিন আগেও এই মাঠ বৃষ্টিতে কাদামাখা ছিল। গতকাল রোববার সকাল থেকে প্রখর রোদে শুকিয়ে গেছে। রোদ মাথায় নিয়েই লাখ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে সকাল ৯টার মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যায় ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের মাঠটি। মানুষের অবস্থান গিয়ে ঠেকে কাছের উঁচু পাহাড়েও। রোহিঙ্গা ঢলের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এদিন কুতুপালংয়ের সব পথ মিশেছে এখানে। সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, নাগরিকত্ব আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে তারা সবাই একসঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাবেন।

সকাল ৯টায় সমাবেশ শুরু হয়। রোহিঙ্গারা সাদা টি-শার্ট পরে আসেন, যাতে কালো কালিতে লেখা ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর রোহিঙ্গাস’। রোহিঙ্গা নারীরা সাধারণত ঘরের বাইরে বের হন না। তবে ওই সমাবেশে যোগ দেন তাদের অনেকে। ‘রি-স্টোর আওয়ার সিটিজেনশিপ’, ‘উইমেন সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’- এমন স্লোগান সংবলিত নানা পোস্টার প্রদর্শন করেন তারা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশে পাড়ি দেওয়া শুরু করেন। ফলে এ দিনটিকে তারা শোকের দিন হিসেবে পালন করে আসছেন। এই দিনে নিহত সতীর্থদের স্মরণ করেন এখানে সমবেত রোহিঙ্গারা। শোকের পাশাপাশি মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়ে নিজভূমে ফেরার দাবিতে সংহতি প্রকাশ করেন তারা। তাদের একটিই দাবি- নির্যাতনের শিকার হয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে এসেছি, নাগরিকত্ব পেলে সবাই একসঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাব। গতকালের সমাবেশ থেকে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও ভিটেমাটি ফিরিয়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সংলাপ আয়োজনের দাবি তোলেন রোহিঙ্গারা। সমাবেশে প্রায় সব বক্তাই প্রত্যাবাসনবিরোধী বক্তব্য দেন। শর্ত না মানলে মিয়ানমারে ফেরত যাবেন না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এ ছাড়া যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিজ্ঞাও করেন রোহিঙ্গারা।

গত বছর এ দিবসে রোহিঙ্গাদের সমাবেশে তেমন উপস্থিতি না থাকলেও এবার  চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষ আসতে থাকেন। আগের দিন থেকেই সমাবেশ ঘিরে আয়োজকদের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার জমায়েতের লক্ষ্য নিয়ে তারা প্রচার চালিয়েছেন। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সাদা পোশাকের সঙ্গে লুঙ্গি পরে সমাবেশে যোগ দেওয়ার পরামর্শও ছিল। সম্প্রতি প্রত্যাবাসন ও স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দূরত্ব সৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গারা তাদের শক্তি প্রদর্শনের জন্যই এত লোকের জমায়েত করেছেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

কুতুপালংয়ে লম্বাশিয়ার ক্যাম্প-১ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে সমাবেশে যোগ দেন আবুল কালাম। তার চোখেমুখে শোক, ক্ষোভ আর আতঙ্ক ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের জুলুম-নির্যাতনের দিন। সমাবেশে যুক্ত হয়ে পৃথিবীর কাছে বিচার চাচ্ছি। আমাদের জন্য ন্যায়বিচার কেউ করছে না। বিচার করে দিন। আর বাংলাদেশ-মিয়ানমার মিলে ফয়সালা করতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যা।’

উখিয়ার মধুছড়া থেকে সমাবেশে যোগ দিতে আসা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, ‘আজ আমাদের কালো দিন। সবাই মিলে একসঙ্গে পালন করছি। সীমান্ত পাড়ি দিলে আমরা একসঙ্গেই ফিরব।’

সমাবেশে রোহিঙ্গা ভাষায় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। যার অর্থ- ‘আমরা গণহত্যার শিকার হয়েছি, আমরা গণহত্যা থেকে বেঁচে ফিরেছি। আমরা আমাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।’

সমাবেশে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলেন, মিয়ানমার মুখে বলল, আর ফিরে গেলাম, তা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমাদের নিজস্ব অধিকার দিয়ে ফিরিয়ে নিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ করতে হবে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনে জড়িত সেনাবাহিনী এবং উগ্রপন্থি মগদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে অসংখ্য মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে মিয়ানমার।

তরুণ প্রতিনিধির বক্তব্যে মোহাম্মদ নওখিম বলেন, আমাদের শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ আমরা জানি না। ক্যাম্পে ছোট ছেলেমেয়েদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দিলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হবে।

এ সময় আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ, সহসভাপতি আবদুর রহিম, সংগঠনের প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল, মহিলা সংস্থা ‘শান্তি’র নেত্রী হামিদা খাতুন বক্তব্য দেন।

সমাবেশে অংশ নেওয়া মোহাম্মদ সেলিম সমকালকে বলেন, বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই এই দিনে সমাবেশ করে থাকেন তারা। তাছাড়া গত কিছুদিন ধরে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার আতঙ্ক কাজ করছে তাদের মধ্যে। পুরো পৃথিবীর কাছে আমাদের আকুতি জানাতেই এ ক্যাম্পে এসেছি। আলী আহম্মদ নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, সমাবেশ থেকে আমরা জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাই বিশ্ববাসীর কাছে।

সমাবেশ উপলক্ষে গোটা ক্যাম্পে অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। সমাবেশ শেষে যখন দলবেঁধে নারী-পুরুষ পাহাড়ের কোলের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন অন্যরকম এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ লাইন যেন শেষই হচ্ছে না। সমাবেশ থেকে ফেরা রোহিঙ্গারা জানান, এ সমাবেশে তাদের ঐক্যের সুতা আরও শক্ত হয়েছে। যত জুলুমই আসুক, তারা এক থাকবেন। স্রোতের মতো তারা যেভাবে এসেছেন, শর্ত মানলে আবার স্রোতের মতো নিজভূমে ফিরে যাবেন।

মতামত