‘উলফ প্যাকে’র সদস্যদের ডিভাইসে বোমা তৈরির ম্যানুয়াল

নতুনভাবে হামলার ছক কষছিল নব্য জেএমবির ‘উলফ প্যাকের’ সদস্যরা। তাদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস পরীক্ষা করে বোমা তৈরির ম্যানুয়ালও পাওয়া গেছে। ওয়েবসাইট থেকে এ ম্যানুয়াল সংগ্রহ করেছিল তারা। ঘরে বসেই তারা চেষ্টা চালাচ্ছিল বোমা তৈরির কৌশল রপ্ত করার। মেসেঞ্জারে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত এই সদস্যরা।

তাদের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিবলী শাহাজাদ সাদীর পরিকল্পনা করছিল পুলিশের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানোর। সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল আবাবিল। বিট কয়েনের মাধ্যমে ডার্ক ওয়েব থেকে সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল সে। যশোরে গ্রামের বাড়ি হওয়ায় সীমান্ত এলাকা থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল মাসরিক আহমেদের ওপর।

তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই পুলিশের কাউন্টার টেররিরজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের হাতে শিবলী, মাসরিকসহ ‘উলফ প্যাকের’ পাঁচ সদস্য গ্রেফতার হয়। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে নব্য জেএমবির নতুন পরিকল্পনার তথ্য। এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে বিদেশে পলাতক বাংলাদেশি জঙ্গিদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল কি-না; বিদেশ থেকেও কেউ তাদের অর্থ সহায়তা করেছিল কি-না।

নতুনভাবে এ সংগঠনে বাইয়াত নিয়েছে আরও চার জঙ্গি। অনলাইনে নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যমে  ‘শপথ’ নেওয়ার ছবিও প্রকাশ করে তারা। বাইয়াত নেওয়া চার জঙ্গিকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

সিটিটিসির ডিসি সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, উলফ প্যাকের জঙ্গিরা নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। এই চক্রের আরও কয়েকজনকে খোঁজা হচ্ছে। জঙ্গিদের ব্যাপারে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ৮ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ‘উলফ প্যাকের’ পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো- কুমিল্লার মোহাম্মদ শিবলী শাহাজাদ ওরফে সাদী, বরিশালের শাহ এম আসাদুল্লাহ মর্তুজা কবীর ওরফে আবাবিল, যশোরের মাসরিক আহমেদ, টাঙ্গাইলের আশরাফুল আল আমীন ওরফে তারেক ও খুলনার এসএম তাসনিম রিফাত। তাদের মধ্যে সাদী ও আবাবিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মাসরিক যশোর এম এম কলেজ থেকে বিবিএ শেষ করেছে। তারেক ও রিফাত চলতি বছর এইচএসসি পাস করেছে। তাদের কাছ থেকে ১০টি ডেটোনেটর এবং চারটি গ্যাসের বোতল জব্দ করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নব্য জেএমবির সদস্যরা এর আগে স্লিপার সেলের মাধ্যমে জড়ো হয়ে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করত। একেকটি স্লিপার সেলে ৩ থেকে ৭ জন পর্যন্ত সদস্য থাকে। বর্তমানে তারা স্লিপার সেলের পরিবর্তে ‘উলফ প্যাকের’ মাধ্যমে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এ দুটি কাঠামোর মৌলিক পার্থক্য হলো, স্লিপার সেলের সদস্যদের মাথার ওপর একজন ‘নেতা’ বা ‘বড় ভাই’ থাকে। সেলের সদস্যরা কাজ করে তার নির্দেশনায়। এই ‘বড় ভাই’ বা ‘নেতার’ আওতায় একাধিক স্লিপার সেল থাকতে পারে। অন্যদিকে ‘উলফ প্যাকের’ সদস্যদের কোনো ‘নেতা’ বা ‘বড় ভাই’ নেই। এর সদস্যরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়। তারাই গ্রুপের ‘নেতা’, আবার তারাই গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরে ব্লগার রাজীবকে হত্যার সঙ্গে ‘উলফ প্যাকের’ সদস্যরা জড়িত ছিল। এ হত্যায় জড়িত জঙ্গিদের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। তবে হত্যার পর জড়িতরা সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করে। অন্যদিকে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে গুলশানে হলি আর্টিসানে হামলা, শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতে হামলার চেষ্টাসহ একাধিক ব্লগার ও লেখক হত্যায় জঙ্গিদের স্লিপার সেলের সদস্যরা জড়িত।

সিসিটিসির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানান, উলফ প্যাকের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হলেও একই গ্রুপের আরও ৩-৪ জন এখনও পালিয়ে আছে। তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। বসুন্ধরা এলাকায় একটি মসজিদে প্রায় নিয়মিত সাংগঠনিক শলাপরামর্শ করত এ গ্রুপের সদস্যরা। বসুন্ধরা এলাকার ‘ডি’ ব্লকেও তাদের একটি আস্তানা ছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি গুলিস্তান, পল্টন ও খামারবাড়ি ট্রাফিক বক্সের পাশে ইমপ্রোভাইজড ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস (আইইডি) পাওয়া যায়। তবে ওই আইইডির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে গ্রেফতার উলফ প্যাকের সদস্যরা।

মতামত