গৌরীপুর-ঈশ্বরগঞ্জ: ব্র‏হ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে ৯ গ্রামের মানুষ

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি : ব্রহ্মপুত্র নদের করাল গ্রাসে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ভাংনামারী ইউনিয়নের আটটি গ্রামে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যা দেখা দেওয়ায় নদের পানিতে তলিয়ে গেছে ওই ইউনিয়নের তিন গ্রামের সব ঘরবাড়ি। ফেরিঘাট ডুবে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে নৌযান চলাচল। গ্রাম ছেড়ে স্বজনদের বাড়ি ও খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে দুর্গত মানুষ। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ঈশ্বরগঞ্জের উচাখিলা মরিচারচর গ্রামের বাসিন্দারাও।

এ বছর বর্ষার শুরুতেই ব্রহ্মপুত্রঘেঁষা গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের অনন্তগঞ্জ, ভাটিপাড়া, ভাংনামারীরচর, বয়রা, খোদাবপপুর, দূর্বাচর, গজারিপাড়া, খুলিয়ারচরসহ আটটি গ্রামে ভাঙন শুরু হয়। এতে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বন্যা দেখা দেওয়ায় পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, কালভার্টসহ সহস্রাধিক একর ফসলি জমি।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় প্রতিবছরই এ এলাকায় ভাঙন দেখা দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ছয় বছর আগে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু পরের বছরই তা নদে বিলীন হয়ে যায়। এ বছর বর্ষার শুরুতে ভাঙন দেখা দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বন্যা দেখা দেওয়ায় মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। নদের পানিতে পুরোপুরিভাবে তলিয়ে গেছে ভাংনামারী ইউনিয়নের মাঝেরটেক, চরভবখালী ও উজান কাশিয়ার চরের দুই শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার। পানিতে তলিয়ে গেছে অনন্ত ফেরিঘাট। স্রোতের কারণে নৌকা ডুবে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক মাঝির আয়-রোজগার।

ফেরিঘাটের নৌকার মাঝি রাসেল মিয়া বলেন, পানির তোড়ে দুই সপ্তাহ আগে তার দুটি নৌকা ব্রহ্মপুত্রে ডুবে গেছে। নৌকা দুটিই ছিল আয়ের একমাত্র অবলম্বন। এখন পরিবার নিয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

এদিকে ভাটিপাড়া ও খোদাবপপুর গ্রামেও বিরাজ করছে ভাঙন আতঙ্ক। ব্রহ্মপুত্র নদ ভাঙতে ভাঙতে গ্রাম দুটির পাশে চলে এসেছে। গত দুই সপ্তাহে এসব এলাকার অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়েছে। ঘর হারানো পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন। অনেকে ভাঙনের আশঙ্কায় বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছেন। কেটে নিচ্ছেন বাড়ির গাছপালা। হুমকির মুখে পড়েছে ভাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনও। ওই গ্রামের বাসিন্দা সুজাত মিয়া বলেন, ১০ বছর আগেও নদ বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ছিল। এখন ভাঙতে ভাঙতে ঘরের দরজায় চলে এসেছে। ভাঙন রোধে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না করা হলে আগামী বছর ভাটিপাড়া গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

ভাংনামারী ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুন নুর খোকা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোগে ভাঙনের শিকার ও পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দুর্গত এলাকায় সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাঙন রোধে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি। গৌরীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ঈশ্বরগঞ্জের উচাখিলা মরিচারচর এলাকার মানুষও। সেখানেও নদের ভাঙনে বেশকিছু ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মরিচারচর নতুনচর গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক পরিবার। বিলীন হতে চলেছে উচাখিলা-মরিচারচর সড়কের মুন্সিবাড়ী এলাকার অংশটিও।

মরিচারচর নতুনচর গ্রামের আবুল কাশেম জানান, গত কয়েক দিনে তাদের গ্রামে ২০টি ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। গত বুধবার রাতেও গ্রামের হাবিবুর রহমান শাহীন ও মেহের বানুর ঘর চলে গেছে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যাকবলিত ও পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ভাঙন কবলিতদের তালিকা করা হচ্ছে।

মতামত