হুমায়ূন আহমেদ :তাঁর কৌশল

অনলাইন ডেস্ক: হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম দেখি বেশ কয়েক বছর আগে- তাঁর ‘চন্দ্রকথা’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার শোতে। অসাধারণ একটি ছবি। যেমন কাহিনী, তেমনি বৈশিষ্ট্যমি ত কয়েকটি চরিত্র। কেবল তা-ই নয়, প্রতিটি চরিত্রে অভিনয়ও অসামান্য। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাছ থেকে পরিচালক হিসেবে তিনি তাঁদের সর্বোত্তম প্রয়াসটুকু আদায় করে নিয়েছিলেন।

তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধুটি পানভোজনের রসিক। খাওয়াতে ভালোবাসেন। রান্নাও জানেন নানা রকমের- বাঙালি থেকে মোগলাই; থাইল্যান্ডি থেকে ইংল্যান্ডি। ঢাকায় থাকলে তাঁর বাড়িতে ডাক পড়ে মাঝেমধ্যেই এবং এসব আসরের বৈশিষ্ট্যই হলো জমজমাট আড্ডা, স্বর্গ থেকে পাতাল পর্যন্ত তাবৎ বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ আলোচনা, মুখরোচক পরনিন্দা, সেই সঙ্গে হালকা খাবার, গলনোন্মুখ বরফ আর কঠিন পানীয়। রাত এগারোটার পর খেয়েদেয়ে তাঁর গাড়িতে করে বাড়িতে ফেরা। অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু আমি দারুণ উপভোগ করি এই সন্ধ্যাগুলো।

এমনি এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখি সেই বন্ধুর বাসায় হাজির হুমায়ূন। আমি তাঁকে আগেই দেখেছিলাম প্রিমিয়ার শোতে। কাজেই চিনতে পারলাম এক দৃষ্টিতেই। কিন্তু অখ্যাত মানুষ আমি, আমাকে তাঁর চেনার কথা নয়। তাই হইচই আর তৃপ্তির চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষণ কেটে গেল। তারপর আমার বন্ধুটি লক্ষ্য করলেন যে, আমাদের দু’জনের মধ্যে কোনো বাক্যবিনিময় হচ্ছে না। তিনি তখন পরিচয় করিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফৌজি তৎপরতায় দু’জনের তড়াক গতিতে দাঁড়ানো ও আলিঙ্গন। এরপর থেকে যতবারই ওই বন্ধুর বাসায় গেছি প্রায় প্রতিবারেই হুমায়ূন আসতেন শাওনকে নিয়ে। এ আসরে শাওনের গানও শুনেছি বেশ কয়েকবার।

আসরে নিজেদের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন এবং উদ্ভট কল্পনা, সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ ইত্যাদি সবই আলাপ হতো। কখনো তাতে আবেগ মিশত, কখনো উত্তেজনা, কিন্তু সারাক্ষণই প্রবল ধারায় বই তো এন্তার হাসির খোরাক। রবীন্দ্রনাথ, ভূত, চলচ্চিত্র, ধর্ম, আবহাওয়া, বিজ্ঞান, পরকাল, ম্যাজিক- হেন বিষয় নেই যা সেখানে অচল ছিল। একবার প্রায় ডিফেনসিভ ভঙ্গিতে হুমায়ূন বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু আল্লায় বিশ্বাস করি’! সে তার বিশ্বাস যেমনই হোক, একটা বিষয় নিয়ে কখনোই আমরা আলাপ করিনি- যেটা বেগম থেকে বেটি, সাহেব থেকে সহিস [বর্তমানকালে যাকে বলে ড্রাইভার] সবারই সবচেয়ে প্রিয় বিষয়; স্বামী-স্ত্রী গভীর রাতে শুতে গিয়েও প্রেমালাপ বাদ দিয়ে যে-প্রসঙ্গে উত্তেজিত হন- রাজনীতির কথা।

হুমায়ূনের একটা প্রিয় বিষয় ছিল বই পড়া। প্রতিবারেই নতুন নতুন বইয়ের কথা বলতেন। সাধারণ গল্পের বই নয়। বরং অভূতসব বিষয় সম্পর্কিত বই- এমনকি, ভুতুড়ে গল্প। আমাকে জিজ্ঞেস করতেন পড়েছি কি-না। প্রতিবার একই উত্তর শুনতেন আমার কাছ থেকে, পড়িনি। তারপর অনুরোধ করতেন, অবশ্যই যেন পড়ে দেখি। তিনি আমার নামে একটা বই উৎসর্গ করেছিলেন- ‘গল্প পঞ্চাশৎ’। সে বইতেও উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন পড়ার কথা। উইলিয়াম লিয়ন ফেপসের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন : ‘আমি পাঠকদের ভাগ করি দু’ভাগে- এক দল যারা পড়ে মনে রাখার জন্যে, আর-একদল পড়ে ভুলে যাবার জন্যে। আপনি কোন দলে? আজ আর হুমায়ূন নেই, কাজেই অসংকোচে বলতে পারছি- মনে রাখা কি ভুলে যাওয়া তো পরের কথা; আমি বই খুব কমই পড়ি। তাঁর সুপারিশ করা বইগুলোও পড়া হয়নি।

আসলে আমি পড়ি খুব ধীরগতিতে। তাই নিতান্ত দরকারি বই ছাড়া কিছুই পড়ি না, পড়তে পারি না। যেমন, কতকাল যে উপন্যাস পড়িনি, নিজেরই মনে নেই। না, ভুল বললাম, শেষ যে উপন্যাসটি পড়েছি, তার কথা মনে আছে। সেটি তিনিই দিয়েছিলেন আমাকে- ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। বেশ মোটা বই- মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কাহিনী নিয়ে লেখা। গল্প ও বাস্তব তাতে একাকার হয়ে গেছে। বেশ কয়েক দিন লেগেছিল শেষ করতে। কিন্তু শেষ করেছিলাম। আমার উল্টো কোটির লোক হুমায়ূন। পড়তে ভালোবাসতেন। আধাবাস্তব, পরাবাস্তব বিষয়বস্তু তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল। বাস্তবের মধ্যেও তিনি অতিবাস্তবের সন্ধান পেতেন; আবার অবাস্তবকে মন্থন করে তার মধ্য থেকে বাস্তবের অমৃত বের করতেন।

ভাবলে অবাক লাগে, কী করে অত লিখেছিলেন। সেদিন কোনো এক পত্রিকায় তাঁর একটি গ্রন্থ তালিকা দেখলাম। তাতে প্রায় শ’তিনেক নাম। কোথায় সময় পেতেন এত লেখার, আমার মাথায় আসে না। তাও তো কম্পিউটারে লিখতেন না। অবশ্য অনেকবারই বলেছেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিয়মিত লিখতেন। এ সময়ে কারও সঙ্গে দেখা করতেন না। তারপরও, অতগুলো বই লেখা প্রায় অতিমানবের কাজ বলে মনে হয়। লেখা ছাড়া, নাটক এবং সিনেমা ছিল তার প্যাশন, তার পেছনে সময় দিয়েছেন অনেক-অনেক। তা না-হলে তার বইয়ের সংখ্যা কত হতো, সেটা অনুমানের বিষয়। কিন্তু নাটক-সিনেমায় যে-সময় দিয়েছেন, তাকে অপব্যয় বলে ঠাওরালে ভীষণ ভুল হবে। বস্তুত, আমি যে-হুমায়ূনকে চিনি, তাঁকে চিনি তাঁর নাটক-চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

তাঁর উপন্যাসের দিকে তাকালে লক্ষ্য করি, সূচনা থেকে কাহিনী ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আর তার মধ্যে থাকে এমন এক-একটা চরিত্র, যা পাঠকদের ধরে রাখে, আকর্ষণ করে। নয়তো হাজার হাজার ভক্ত তৈরি হতো না হিমু চরিত্রের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। নয়তো তারা পাগলের মতো হলুদ পোশাক পরে বইমেলায় মিছিল করত না। হিমুর মতো মিসির আলিও শিক্ষিত সমাজের আর-একটা গোষ্ঠীকে আকর্ষণ করে। এই গোষ্ঠী আবার হিমুর ভক্ত নয়। এই যে একজন লেখক শিক্ষিত লোকেদের এক-এক অংশের মন এক-একটা চরিত্র দিয়ে ভোলান, অতি অসাধারণ লেখক না-হলে এটা করতে পারা সম্ভব নয়।

শরৎচন্দ্রও খুব জনপ্রিয় কাহিনীকার ছিলেন। কিন্তু তিনি সমাজের এক-একটা অংশের কথা মনে করে কোনো চরিত্র সৃষ্টি করেননি। ‘কাশীনাথ’ থেকে ‘চরিত্রহীন’ কিংবা ‘শেষপ্রশ্ন’ থেকে ‘পথের দাবি’ পর্যন্ত যে-কাহিনীগুলো তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা করেছেন তাবৎ পাঠকের জন্যে। তবে এসবের মধ্যে কারও কাছে ‘রামের সুমতি’ ভালো লাগে, কারও কাছে ‘মেজদিদি’। কারও সতীশকে ভালো লাগে, কারও বা শিবনাথকে। সেটা নির্ভর করে পাঠকদের রুচিভেদের ওপর। নয়তো শরৎ সজ্ঞানে আলাদা-আলাদা পাঠকগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে চাননি।

প্রকাশনা-শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে মধ্যম শ্রেণির শত শত লেখক-লেখিকা তৈরি হয়েছেন, বেশিরভাগই ঘষে-মেজে। অনেকে তাই দিয়েই উপার্জন করছেন এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে পুরস্কার পেয়ে খেতাব বাড়াচ্ছেন। বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ কথাশিল্পীরই কোনো সহজাত প্রতিভা নেই। জোর করে তাঁরা শিল্পী সেজেছেন। কিন্তু একটু তত্ত্ব করলেই, সত্যিকার শিল্পীদের মধ্যে শিল্পীর ছদ্মবেশ-পর দু’নম্বরী অনুপ্রবেশকারী কারা, তা ধরা পড়বেন। তাঁদের কাহিনী শতছিদ্র ‘আজারির চিরে’র মতো। চরিত্রগুলোর নাম এক নয়, কিন্তু মুনীরে আর জমিরে কোনো পার্থক্য নেই। জামিলা আর আমিনাও ভিন্ন নামে একই চরিত্র। এঁদের সঙ্গে হুমায়ূনের তুলনাই চলে না। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান শিল্পী। কাহিনী এবং চরিত্রের ভেতরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।

লিখতে বসার সময়ে গোড়াতেই নিশ্চয় তাঁর মনে একটা কাহিনী থাকত, থাকত কয়েকটা চরিত্র। তারপর ধীরে ধীরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই কাহিনী এগিয়ে চলত, চরিত্রগুলো চেহারা পেতে আরম্ভ করত। কিন্তু এ পর্যন্ত এসে তিনি প্রায়ই সংকটে পড়তেন- উভয় সংকটে। একদিকে সৃজনের আনন্দে শিল্পী হুমায়ূন এগিয়ে যেতে চাইতেন এক পথে; অন্যদিকে জনপ্রিয়তার মরীচিকা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকত আর-এক পথে। জনপ্রিয়তার স্রোতের টানে সব সময় তার অভীষ্ট লক্ষ্যে তিনি পৌঁছাতে পারতেন, এমনটা হলফ করে বলা যায় না।

একটা প্রশ্ন অবশ্য করা যেতে পারে। তিনি জনপ্রিয় হলেন কী করে? অথবা জনপ্রিয়তা বজায় রাখলেন কীভাবে? মনে রাখা দরকার, প্রতিদিনের জীবনের তুচ্ছতা কাউকে আকৃষ্ট করে না। ‘সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত করে নাশতা সেরে অফিসে গিয়ে কাজকর্ম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ টিভি দেখে রাত নটার দিকে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।’- এ রকমের রুটিনবদ্ধ দিন আমাদের বেশিরভাগ লোকের কাছে যতই বাস্তবিক হোক না কেন, কোনো আকর্ষণীয় কাহিনী হতে পারে না। এমন বৈচিত্র্যহীন দিনের কথা শোনার জন্যে কেউ কান পেতে থাকবেন না। হুমায়ূন সব সময়ে ঘটনার ঘনঘটা না হলেও, ঘটনার বৈচিত্র্য খুঁজে পেতেন। বাস্তবের মধ্যেও কৌতূহল জাগিয়ে তোলার মতো ঘটনা, এমনকি, অঘটনা খুঁজে পেতেন। চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব ছিল তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এমন লেখক প্রায়-ঘটনাবর্জিত কাহিনীকেও অতি-আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। হুমায়ূন ছিলেন এই ক্ষমতার অধিকারী।

পাঠককে নিজের দিকে টানার এবং ধরে রাখার তাঁর আর-একটা কৌশল হলো : তাঁর ভাষা। আমার ধারণা, আমাদের দেশের কথাসাহিত্যের একটা বড় দুর্বলতা হলো আমাদের কথাসাহিত্যের ভাষা-বর্ণনার, তার থেকেও বেশি সংলাপের ভাষা। একজন ঔপন্যাসিকের কথা মনে পড়ছে- অনেক উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু এখনো গল্পের ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। যে-ভাষায় লেখেন তা দিয়ে প্রবন্ধ লিখলেই বেশি উপযোগী হতো। আর-একজন শ্রদ্ধেয় ঔপন্যাসিকের কথা মনে হচ্ছে, তিনি বেশ ভাষা-সচেতন সাহিত্যিক। আমি তার দুটি উপন্যাস পড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে। দুটো উপন্যাসই আমার খুব ভালো লেগেছিল। কিন্তু এক-একটা জায়গায় তাঁর কোনো কোনো শব্দের ব্যবহার আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল। রসভঙ্গ করেছিল। মনে হয়, তাঁদের ভাষাটা স্বচ্ছন্দে পড়া যাচ্ছে কিনা, সে সম্পর্কে অনেক ঔপন্যাসিকই সচেতন নন। বোধ হয় নিজে একবার পড়েও দেখেন না। চলতি ভাষার মতো হচ্ছে কিনা, তাও একবার বিচার করে দেখেন না।

সত্যি বলতে কী, বাংলাদেশের লেখকদের ভাষার ভিত্তিটা হলো সাধুভাষা; তাই সজ্ঞানে চলতি ভাষা লিখতে গিয়ে তারা সাধু-চলতির মিশ্রণ ঘটিয়ে ফেলেন। আমাকে একবার বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলি লিখেছিলেন যে, তাঁরও সমস্যা হলো এটাই, তিনিও চলতি ভাষা লিখতে পারেন না স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে। মাঝেমধ্যেই সাধুভাষার শব্দাবলি লেখার আড়াল থেকে উঁকি মারে। আমার বিবেচনায় বুদ্ধদেব বসুর ভাষা অত্যন্ত সাবলীল এবং সুললিত। তাঁর ভাষা সম্পর্কেই যদি এ রকম মন্তব্য করা যায়, তা হলে আমাদের কাহিনীকারদের ভাষা সম্পর্কে কী মন্তব্য করা যেতে পারে, তা সহজেই অনুমান করতে পারি। প্রথম দিকের উপন্যাসের কথা বলব না; কিন্তু অনেক বছর থেকেই হুমায়ূন স্রোতের মতো সহজ গতিতে প্রবাহিত হয়- এ রকমের একটা ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। তাঁর ভাষা পড়তে গিয়ে হোঁচট খেতে হয় না। তাঁর ভাষায় সাধু-চলতি মিশ্রণের কথা অবশ্য না বলে পারছি না। তিনি ভাষার এমন জাদুকর হয়েও ‘দিব’ ‘নিব’ লিখতেন। অর্থাৎ তার মধ্যে আঞ্চলিকতার ছাপ থাকত।

সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষা পাঠকদের ধরে রাখার অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার, কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো গল্প বলার কৌশল। এক-একজন আছেন গল্প বলার জাদু জানেন। বলার কৌশলে তাদের অর্থহীন গল্পও আমাদের মুগ্ধ করে। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গল্পকারের বর্ণনাকে চোখের সামনে মূর্তিমান হয়ে উঠতে দেখি। শরৎচন্দ্রের কোনো কোনো গল্প আছে জোর করে বানানো- অবাস্তব। কিন্তু রূপকথার গল্প পড়ে বাস্তব কি অবাস্তব সেই প্রশ্ন যেমন আমরা করি না, তেমনি শরৎচন্দ্রের উপন্যাস পড়েও আমরা বাস্তবতা-অবাস্তবতার বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। বিমল মিত্রও এমনি একজন গল্পকার। হুমায়ূন আহমেদ শরৎচন্দ্র অথবা বিমল মিত্র নন; কিন্তু পাঠককে গল্পবন্দি করার জন্যে সূক্ষ্ণ জাল কী করে ফেলতে হয়, তিনিও তা ভালো করেই শিখেছিলেন। শিখেছিলেন না-বলে বরং বলি এ ছিল তাঁর সহজাত। সেই জালে পড়ে তাঁর পাঠকরাও স্বপ্ন দেখতে পারেন, স্বপ্ন দেখেন।

পাঠকদের ধরে রাখার তাঁর আর-একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য কৌশল হলো, তাঁর অসাধারণ রসিকতা। তাঁর অনেক নাটক দেখে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছি। হাসির নাটকে হাসবো, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তার দুঃখের কাহিনীর মধ্যেও থাকে হাসির খোরাক। সেই হাসি কান্নাকে আরও ঘনীভূত করে। তাঁর গানগুলো হৃদয়কে মোচড় দিত। তাঁর মৃত্যুর পর ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়’ অথবা ‘চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’ গান দুটো শুনে অনেকবার কেঁদেছি। তাঁর নাটকে বাড়তি আকর্ষণ এই গানগুলো। সবকিছু মিলে হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যের একজন অসামান্য লেখক, ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব।

বই পড়া আমাদের ধাতে নেই। এমন যে রবীন্দ্রনাথ, তিনিও নামেই বিশ্বকবি, নয়তো আমাদের কাছে তাঁর অস্তিত্ব ‘আমাদের ছোটো নদী’ অথবা ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’র মতো দু-একটি শিশুপাঠ্য কবিতার দু-চার লাইন পর্যন্ত। নজরুল ইসলামও তথৈবচ। তিনি মুসলমানের ঘরে জন্মেছিলেন- এই নিয়ে যতই গর্ব করি না কেন, পড়ার বেলাতে আমাদের দৌড় ‘লিচু চোর’ কি ‘ভোর হল দোর খোল’ পর্যন্ত। যাঁরা আর-একটু বেশি খবর রাখেন, তাঁরা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম স্তবকের দু-একটা লাইনও জানেন। আমাদের সেই পাঠবিমুখ বাঙালি জাতিকে সবার আগে বইপড়া প্রথমে ধরিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। তারই কল্যাণে মধ্যবয়সী মায়েরাও দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় যেতেন ‘দেবদাস’ কি ‘মেজদিদি’ নিয়ে। কিন্তু শরৎচন্দ্র মারা যান ৭৪ বছর আগে। তারপর এত দিনে তিন-চারজন ঔপন্যাসিক ছাড়া, অন্য যেসব কবি-সাহিত্যিক জন্মেছেন তাঁদের প্রায় সবার সীমাই ১১০০ কি ১২৫০। এসব সাহিত্যিককে যোজন যোজন পেছনে ফেলে হুমায়ূন আহমেদ এগিয়ে গেছেন অনেক দূরে। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বহুলপঠিত লেখক তিনি। একটা অলস জাতিকে বইমুখী করার এই অসামান্য অবদান তার। তাঁর সাহিত্যের মান? মানের কথা বলছি না। তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সাহিত্য কত দিন টিকে থাকবে, সেও দেখার বিষয়। কিন্তু তিনি আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার ওপর তাঁর নাটক রাতের বেলা আড্ডা দিয়ে-দেরিতে-ফিরে-আসা লোকগুলোকে ঘরমুখী করেছিল। তাঁর নাটকের একটি চরিত্র- বাকের ভাইয়ের ফাঁসি দেওয়া যাবে না বলে দেয়ালে দেয়ালে লেখা আর মিছিল বের করার মতো ঘটনা হুজুগে বাঙালিদের মধ্যেও অতি বিরল। আর, বিশ্বে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার স্বল্প জ্ঞানে জানা নেই।

সেই হুমায়ূন মারাও গেলেন মেগা-সিরিয়ালের মতো নাটক করে। তার জনপ্রিয়তা এতই বেশি ছিল যে, তার কোনো একটা খবর নিদেনপক্ষে একটা অ-খবর, আর অ-খবরও তৈরি করা সম্ভব না-হলে গুজব, স্রেফ গুজব নির্মাণের কাজে ব্যস্ত থাকত পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া। কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের ভাগ্যে মিডিয়ার এত হৈচৈ জোটেনি- এত পত্রপত্রিকা অথবা এত টেলিভিশন চ্যানেল কোনোকালেই ছিল না।

তিনি যখন নিউইয়র্কে চিকিৎসা করাতে যান তখন তাঁর ক্যান্সার চতুর্থ পর্বে পৌঁছেছিল। তার মানে যেখানে গোড়ায় ক্যান্সার হয়েছিল, সেই কোলন বা অন্ত্র থেকে তা লিভারে ছড়িয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া, আগে থেকেই তার ছিল ডায়াবেটিস। হূৎপিণ্ডে বাইপাস করিয়েছিলেন অনেক আগে। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জীবনবাদী, আশাবাদী হুমায়ুন একটা-দুটো নয়, বারোটা কেমো নিয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় রক্তে লোহিত কণিকায় ঘাটতি পড়েছিল দুই-এক বার। ওষুধ দিয়ে তা বাড়াতে হয়। বারোটা কেমো নিয়ে তাঁর অন্ত্রের এবং লিভারের ক্যান্সার সংকুচিত হয়েছিল, কিন্তু বিলীন হয়নি।

অতঃপর? ওরাল কেমো নিয়ে বছর দুয়েক বেঁচে থাকতে পারতেন, নয়তো পারতেন ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্রোপচার করিয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে। সেটাই করেছিলেন তিনি। এটা সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অপারেশন হলো। দ্বিতীয় সার্জারির কিছুদিন পর তার কিডনি বেঁকে বসেছিল। এ ছিল : হুমায়ূন নামক মহানাটকের শেষ অঙ্কের সূচনা। আর এদিকে, নিউইয়র্কের উল্টো পিঠ বাংলাদেশে শুরু হলো ক’দিনের জন্যে মিডিয়ার মচ্ছব। যে যা পারছে লিখছে; যে যা পারে বলছে, হুজুগী এবং গুজবী মধ্যবিত্ত বাঙালিদের ঘরে ঘরে আলোচনায় প্রধান উপাদান জুটলো। প্রত্যেকেই বিশেষজ্ঞ, প্রত্যেকেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আছে, অনেকে চূড়ান্ত ফলাফলও বলে দিচ্ছেন।

একে-একে তিনটা অস্ত্রোপচার হয়েছিল তার ওপর। ডাক্তাররা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কৃত্রিমভাবে ঘুম-পাড়িয়ে রাখা হুমায়ূন ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকলেন অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে। তৃতীয়বার অস্ত্রোপচার করার আগেই রক্তে সেপ্টিসিমিয়া হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে অলৌকিক ঘটনা ছাড়া কেউ ফিরে আসে না। হুমায়ূন অসামান্য মানুষ ছিলেন, কিন্তু অতিমানব ছিলেন না। সুতরাং তিনিও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন মৃত্যুর কাছে।

মৃত্যুর সঙ্গে তার এই লড়াই আমি প্রত্যক্ষ করিনি। আমি লন্ডন থেকে ফোন করে খবর নিতাম ড. পূরবী বসুর কাছ থেকে। বোধহয় তিন/চার দিন ছাড়া, অপারেশন-পরবর্তী দিনগুলোতে রোজই আমি ফোন করতাম পূরবীকে। তাকে এবং তাঁর স্বামী ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে বিরক্ত করার জন্যে নিজেকে অপরাধী মনে হতো। শাওনকেও কয়েকবার ফোন করেছি। কিন্তু ওর ব্যস্ততার কথা ভেবে বিরক্ত করতে মোটেই ভালো লাগত না।

জীবদ্দশায় হুমায়ূনের সঙ্গে আমার বড় একটা যোগাযোগ হতে পারেনি। তিনি ঢাকায়, আমি লন্ডনে। তার ওপর, তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র তিন-চার বছর।

কিন্তু নিউইয়র্কে হাসপাতালে অজ্ঞান হুমায়ূনের সঙ্গে মনে মনে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। রক্তচাপ বহাল রাখা যাচ্ছে না- সর্বোচ্চ মাত্রায় ওষুধ দিয়েও এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য লক্ষণের কথা শুনে বুঝতে পারছিলাম, তিনি নিশ্চিত এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। কেবল আশা করতাম, কোনো একটা অলৌকিক ঘটনায় তিনি যদি হঠাৎ জেগে ওঠেন! উঠলেন না। কিন্তু হৃদয়ে তিনি জেগে থাকবেন, জেগে থাকবেন যত দিন আমি জেগে আছি।

মতামত