জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিস থেকে মূল নকশা চুরির অভিযোগ চৌদ্দগ্রামে বিএস নকশা খতিয়ান ভুল, দুই মৌজার ভূমি মালিকদের মাথায় হাত

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা:
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মুন্সিরহাট ইউনিয়নের দুই মৌজার সিএসের নতুন নকশা খতিয়ান হাতে পেয়ে কৃষক ও ভূমি মালিকদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। খতিয়ানে উল্লেখিত ভূমির সাথে নকশা এবং হালদখলের মিল না থাকায় কেউ জমিজমা ক্রয়-বিক্রয় ও চাষাবাদ করতে পারছে না। শিগগিরই ভুল নকশা সংশোধন করার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগীরা।


বিভিন্ন দপ্তরে বাহেরগড়া ও বসন্তপুর গ্রামবাসীর উদ্যোগে দেয়া আবেদন পত্রে উল্লেখ করা হয়, মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বাহেরগড়া ও হাড়ীমুড়া মৌজা জেলএল নং-১৪৭ ও ১৭৯। ১৯৯৩-৯৪ সালে ওই এলাকায় ভূমি জরিপ হয়। পরবর্তীতে ভূমির মাঠ খতিয়ান কৃষকদের মাঝে বিলি করা হয়। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে কৃষকদের মাঝে চুড়ান্ত ছাপা খতিয়ান ও নকশা বিতরণ করা হয়। নকশায় দেখা যায়,১৯৯৩-৯৪ইং সালের মাঠ ফসড়া বিএস নকশার সাথে ২০১৮ সালের বিএস নকশার কোন মিল নেই। ফলে একজনের প্লটে অন্যজনের মালিকানা সৃষ্টি হয়েছে।

জমির মালিকানা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবি ও জমি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে জটিতলার সৃষ্টি হয়েছে। আবেদনপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় লোকজন খবর নিয়ে জানতে পেরেছে ৯৩-৯৪ সালের বিএস নকসাটি জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিস থেকে চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে খতিয়ান নকশা ছাপানোর জন্য পাঠাতে জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিস কোন উপায় না পেয়ে বাহেরগড়া গ্রামের জনৈক সাহাব উদ্দিন থেকে একটি পুরাতন নকশা সংগ্রহ করে জোনাল অফিসে বসে মনগড়া বিএস নকশা তৈরি করে। যা মাঠের তৈরি ফসড়ার সাথে কোন মিল নেই।


সরেজমিন অনুসন্ধানে এবং কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, হাড়ীমুড়া মৌজায় সিএস ৯৯ দাগের সম্পত্তির মালিক ইদ্রিস গং। বিএস করার সময় মালিক দখলীয়দের নামে ওই প্লট ভাগ করা হয়। বিএস ১৬১ দাগের সম্পত্তির মালিক কালা মিয়া। তার সম্পত্তির পরিমাণ খতিয়ানে ১৮ শতক হলেও ভূল বিএস নকশার প্লটে ৩৮ শতক রয়েছে। এই প্লটের দক্ষিণ অংশে ১৬০ দাগ।

খতিয়ানে উক্ত সম্পত্তির মালিক ইদ্রিস মিয়ার নামে উল্লেখ রয়েছে। অথচ নকশায় ইদ্রিস মিয়ার দখলীয় সম্পত্তির উপর না দেখিয়ে মাওলানা আবদুল মান্নানের সম্পত্তিকে ১৬০ দাগ দেখানো হয়েছে। বিএস খতিয়ানে ১১৭ দাগে ২০ শতক জমির মালিক মকবুল আহমেদ। তার প্লটটি সড়কের পাশে থাকলেও ভূল নকশায় আরও এক প্লট পরে উল্লেখ করা হয়েছে। তার জায়গায় ১২০ দাগ উল্লেখ করা হয়। বিএস খতিয়ানের ৪২৩ দাগে ৩২ শতক জমির মালিক ছমির উদ্দিন। এ জায়গা সিএসে হাড়িসর্দার-মুন্সিরহাট কলেজ সড়কের পাশে থাকলেও নতুন বিএসে এক প্লট পরে দেখানো হয়েছে।

বিএসে সড়কের পাশে থাকা ৪১৫ দাগে ৩০ শতকের মালিক নুরুল ইসলাম। বিএস ৪৩০ দাগে ৪৬ শতক জায়গার মালিক মকবুল আহাম্মেদ মজুমদার। তার জমি সিএস খতিয়ানে সড়কের পাশে থাকলেও বিএসে এক প্লট পরে দেখানো হয়েছে। সড়কের পাশে দেখানো হয়েছে ৪৩১ দাগকে। সিএস অনুসারে ৩৫৯ দাগে আবদুর রাজ্জাকের জমির ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা।

তার জমি বি এস খতিয়ানে ৩৬০ দাগ দেখানো হয়েছে, অথচ নকশায় যে প্লটকে ৩৬০ দাগ দেখানো হয়েছে তার দখলীয় মালিক আবদুল গফুর। এসব ক্ষেত্রে সম্পত্তির পরিমাণেও হেরপের রয়েছে। সরকারি খাস জায়গার দাগও ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। হাড়িমুড়া মৌজার ন্যায় বাহেরগড়া মৌজার চিত্রও একই। যারা জমি কেনা-বেচার চেষ্টা করছেন, তারাই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাছাড়া জমিতে আবাদ নিয়েও নতুন করে ঝগড়া-বিবাদ ও খুন-খারাবির আশঙ্কা রয়েছে।
ভূল নকশাটি বাদ দিয়ে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে পুনরায় সঠিক নকশা দ্রুত প্রস্তুত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সেলিম মজুমদার, শাহজাহান মজুমদার, আলকাছ মিয়া, মনোহর আলী, আবদুস সালাম, আবদুল মালেক, মমতাজ উদ্দিন, আবদুল জব্বার, রহিমা বেগম ও জহিরুল হক।

তাঁরা প্রধানমন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সাংসদ মুজিবুল হক, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিস, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার ভূমি, সহকারী সেটেলম্যান্ট অফিসার চৌদ্দগ্রাম, মুন্সিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান বরাবরে আবেদনপত্র প্রেরণ করেন।
এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম সহকারী সেটেলম্যান্ট অফিসার সামছুল আলম ভুঁইয়া বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না থাকায় খতিয়ান ও নকশা যাচাই করা সম্ভব হয়নি’। তার অফিস থেকে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তপক্ষকে জানানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি সদ্য এসেছি বলে এড়িয়ে যান।


কুমিল্লা জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার মোঃ সামছুল আলম জানান, ‘আমি নতুন এসেছি, এবিষয়ে কিছুই জানিনা, জেনে বলতে হবে। অভিযোগের বিষয়টিও জানা নেই বলে জানান।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি দীপন দেবনাথ বলেন, ‘সমস্যাটি সেটেলম্যান্ট অফিসের, তাই আমাদের কিছু করণীয় নেই। তবে ভুক্তভোগীরা ল্যান্ড ট্রাইব্যুনাল গিয়ে মামলা করতে পারে’।

মতামত