“মায়ের চিঠি” : বিশিষ্ট লেখক, কবি ও সাহিত্যিক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন

মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি: বিশ্ব মা দিবস স্মরণে বিশিষ্ট লেখক,কবি ও সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীনের আত্মজা লিখিত গল্প ‘মায়ের চিঠি।

বহুদিন পরে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি এলেন আসাদ চৌধুরী। তিনি ঢাকার এক নামকরা ইন্ডাস্ট্রির বড় কর্মকর্তা। তার মা মারা যাওয়ার সময় তিনি তখন ছিলেন লম্বা বিদেশ সফরে। তাই কত বছর হয়ে গেল তার জন্মস্থানকে ভুলে থেকেছেন। আজ সপরিবারে বাড়ি পৌঁছলেন সকাল সকাল। গত পাঁচ বছর আগে যখন মা মারা যান তখন থেকে বাড়িতে আর আসা হয়নি। আজ অনেক বছর পর আসা। বাড়ির সামনে গিয়ে দেখেন খুব খারাপ অবস্থা। দরজার তালাটায় জং ধরেছে। আঙিনায় ঝোপ-জঙ্গল বেশ বড় হয়েছে। ঘরের কোণায় কোণায় মাকড়সা বাসা বেঁধেছে। সব মিলিয়ে বাড়িটাকে দেখতে বিদঘুটে লাগছে। তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন মিসেস আসাদ। পেছন পেছন ঢুকল সবাই। এতবড় আলিশান বাড়ি, অথচ দেখাশোনার কোনো মানুষ নেই। ধুলোয় একাকার হয়ে আছে মেঝে।

ফ্রেস হয়ে দুপুরের খাবারটা সেরে আসাদ চৌধুরী একটু বিশ্রাম নিলেন। বিকেলে বের হলেন তার একমাত্র ছেলে আফরানকে নিয়ে গ্রাম দর্শনে। বহুদিন পর তার গ্রামে আসা। তাই স্মৃতি কাতরতায় ভূগছেন তিনি। গ্রামের অনেক কিছুর পালাবদল হয়েছে। তবু ভালমন্দ সব মিলিয়ে তার ভালই লাগছে গ্রাম। অনেক জায়গার উন্নতি হয়েছে। বাড়ির পাশের যে নদীতে পাঁচ বছর আগে একটা সাঁকো ছিল, সেটা এখন আর নেই। তার জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন একটি ব্রীজ। কাঁচা রাস্তার বদলে পিচঢালা রাস্তার সংখ্যা বেড়েছে। কতক জমিতে চাষ হয়েছে। আর কতক জমি সংকুচিত হয়ে দখল করে আছে বিশাল বিশাল দালান। তিনি বুঝলেন শহর ছেড়ে ডেভেলপারদের আনাগোনা এখানেও শুরু হয়ে গেছে।

বিকেল হলেও তেমন ঝিরঝিরে বাতাস নেই। থাকলেও তা গ্রামে ঘিঞ্জি হয়ে আসা বসতির কারণে গায়ে লাগছে না। ভ্যাপসা গরমের এক একটি হলকা তাকে অস্থির করে তুলছে। দ্রুত পা চালান তিনি। তিনি আফরানকে নিয়ে কবরস্তানে গিয়ে বাবা-মার কবর যেয়ারত করলেন। সেখানে বসে কিছুক্ষণ সময় কাটালেন। আশেপাশে কোনো লোক নেই দু’চারটি কথা বলার। তাই তিনি ফিরছিলেন বাড়ির দিকে। ফেরার পথে দেখা হল একজন অপরিচিত লোকের সাথে। বয়স তার চল্লিশোর্ধ্ব। মাথায় টাক। সূর্যের আলোয় তা জ্বলজ্বল করছে।‘এই যে ভাই’- আগ বাড়িয়ে কথা বললেন আসাদ সাহেব। লোকটা খুব বিরক্তিভরে তাকালেন তার দিকে।‘কিছু বলবেন?’‘না মানে, একা একা হাঁটতে ভাল লাগছে না। তাই বলছিলাম কি আমরা কিছুক্ষণ বসে যদি গল্প করি ……….।

আপনি একা কোথায়? সাথে ছেলে নিয়ে এসেছেন না? তাছাড়া আমারও এ বেলা আপনার সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে না। আমি যাই।’বলেই লোকটা হনহন করে নিজের একমাত্র পুরনো সাইকেলটা নিয়ে হাঁটা দিল। এরকম গুমোট আবহাওয়ায় লোকটা সাইকেলে না চড়ে সাইকেলটাকে ঠেলে হাঁটছেন কেন, তা কিছুতেই বুঝতে পারলেন না আসাদ সাহেব। অগত্যা তিনিও বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। ধীরে-সুস্থে হেঁটে তার বাড়ি পৌঁছতে বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে গেল। কিন্তু কিছুতেই তিনি অদ্ভুত সাইকেলওয়ালা লোকটার কথা ভুলতে পারলেন না। 

পরদিন সকাল বেলা আসাদ সাহেব ঘরের বাইরে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। এমন সময় সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হলো আগের দিন রাস্তায় দেখা সেই সাইকেলওয়ালা লোকটা। লোকটাকে নিজের বাড়িতে দেখে আসাদ সাহেব কিছুটা ভড়কে গেলেন। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে লোকটি আগমন করেনি তো! লোকটা কাছে এসে বলল:আসলে কালকের ব্যাপারটার জন্য আমি দুঃখিত। ক্ষমা চাইতে এসেছি।
না, ও কিছুই না। আপনি বসুন। ভদ্রতা দেখালেন আসাদ সাহেব, কেমন আছেন? লোকটা বলল: তেমন ভাল নেই। একটা পোস্ট অফিসে চাকরি করি। বেতন তেমন ভালো না।আসাদ সাহেব বললেন: আপনার ঘরে আর কে কে আছেন?আর কেউ নেই। আমার একমাত্র ছেলেটা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে অনেক আগে। এখন থাকে শ্বশুর বাড়িতে। আর আমার স্ত্রী মারা গেছেন এক বছর আগে।নাস্তা নিয়ে আসলেন মিসেস আসাদ চৌধুরী।আসাদ সাহেব বললেন: সকালে কিছু খেয়েছেন?লোকটি বলল: না, খাওয়া হয়নি।তাহলে এখান থেকে কিছু খান।লোকটা একটু হাসলো। আর সহজভাবে খাবার তুলে নিলো। মনে হল যেন কত দিনের পরিচিত। আসাদ সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন:আপনার নামটা কী?লোকটি বলল: মফিজ।আর আপনার নামটা আমি জানি, আসাদ চৌধুরী।আপনি কী করে জানলেন?দেখুন এই বাড়িটা আমার খুব পরিচিত। আজ প্রথমবার নয়, এই বাড়িতে বহুবার এসেছি। আপনার মা আমাকে খুব ভালবাসতেন।

ভাল কিছু রান্না হলে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিতেন কিংবা আমাকে ডেকে আনতেন। আমিও সব সময় তার খেয়াল রাখতাম। এক নাগাড়ে সব কথা বলল লোকটা।তাহলে তো আপনি আমার মায়ের খুব কাছের লোক। আপনাকে ধন্যবাদ সব সময় মায়ের খেয়াল রাখার জন্যে।আজ তবে ওঠি, পরে দেখা হবে।এই বলে মফিজ নামের লোকটা চলে গেল। সারারাত মফিজের কথা ভাবলেন আসাদ চৌধুরী। তিনি নিজে ছেলে হয়েও মায়ের যতটা যত্ন নেননি, লোকটা তার চেয়ে বেশি যত্ন নিয়েছে। মায়ের সুখ-দুঃখের ভাগি হয়েছে। পরদনি সকাল বেলা হাঁটতে বের হলেন আসাদ সাহেব। মাঠের ওপারে দেখা হয়ে গেল লোকটার সাথে। সত্যিই আসাদ সাহেব ধারনা করেছিলেন, দেখা হবে লোকটার সাথে। আর তাই হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন লম্বা এক খাম। দেখা হতেই দ’জন কুশল বিনিময় করলেন। আসাদ সাহেব তার হাতে খামটা ধরিয়ে দিলেন। লোকটা কিছুটা অবাক হলো! বলল:কিসের খাম এটা, চিঠির নয়তো? কাউকে পৌছে দিতে হলে বলুন, আজই পৌছে দেবো।না, এটা কোনো চিঠি নয়। আমার পক্ষ থেকে আপনাকে সামান্য উপহার।বাড়ি গিয়ে খামটা খুলতেই অবাক হয়ে গেলেন পোস্ট মাস্টার মফিজ।

খামের ভেতর মোটা অঙ্কের টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি দুই মাস ভালভাবেই কাটিয়ে দিতে পারবেন। মনে মনে খুব করে ধন্যবাদ দিলেন আসাদ সাহেবকে।পরদিন ভোরবেলা মফিজ গেলেন আসাদ সাহেবের বাড়িতে। হাতে তার থলে ভরা গোটা দশেক আম। আর ছোট্ট একটা খাম। থলেটা আসাদ সাহেবের হাতে দিয়ে বললেনঃআমার গাছের আম, ভারি মিষ্টি। আমি বাড়িতে না থাকলে দস্যি ছেলেপিলেরা খেয়ে ফেলে। তাই বেশি আনতে পারিনি।আসাদ সাহেব বললেনঃ এনেছেন সেটাই ঢের বেশি। আজকাল এ রকম খাতির ক’জনেই বা করে।এবার মফিজ খামটা আসাদ সাহেবকে দিলেন। আসাদ সাহেব বললেনঃএ আবার কীসের খাম? টাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছেন?মফিজ সাহেব বললেনঃ না ভাই। এটা কোনো টাকার খাম নয়। তবে টাকার চেয়ে মূল্যবান। আপনার মায়ে চিঠি।মায়ের চিঠি?অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন আসাদ সাহেব। মফিজের হাত থেকে খপ করে টেনে নিলেন খামটি। সত্যিই তো! প্রেরক আঞ্জুমান আরা বেগম। আর প্রাপক আসাদ আহমেদ চৌধুরী। খামের ভেতর থেকে নিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন তিনি। চিঠিতে যে তারিখটা লেখা আছে তা প্রায় পাঁচ বছর আগের। চিঠিতে লেখা-

স্নেহের আসু,কেমন আছিস বাবা? আশা করি আল্লাহর দয়ায় বেশ ভালো আছিস। মিতা আর আফরানও নিশ্চয় ভাল আছে। কিন্তু আমি ভালো নই রে বাবা। তোর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে খুব একা হয়ে গেছি। যদিও তারিক আর মিনা ঘরে থাকে। মিনা ঘরের সব কাজ করে দেয়। আর তারিক বাজার করে। শত করলেও তারা তো আর আমার আপন কেউ না। তবে আজকাল আমার বাড়িতে একজন লোক প্রায়ই আসে। সে হলো মফিজ। মফিজকে চিনতে পারলি না? আমাদের গ্রামের একমাত্র পোস্ট মাস্টার। সে আমার বেশ যত্ন করে। সময়ে সময়ে এসে খোঁজ-খবর নেয়। তার ঘরে কেউ নেই। সেও আমার মতো একা। তাই চলে আসে। আমিও তাকে বেশ খাতির করি। বাবা আসাদ, তুই তো মাসে মাসে টাকা পাঠাস, কিন্তু একটা চিঠিতো লিখিস না। তোর বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে আমার দিব্যি চলে যায়। তোর টাকাগুলো আমি মিনা আর তারিককে ভাগ করে দেই। ওরা খুব খুশি হয়। দেখ্, তোর টাকা তো আমার কোনো কাজে আসে না। তার চেয়ে তোর চিঠি হবে আমার কাছে অনেক মূল্যবান। গত দুবছর আমার ঈদ একেবারেই ভালো কাটেনি। তোরাও ছিলি না। আমি আর মিনা সব নাস্তাই বানিয়েছিলাম। শুধু অভাব পড়েছিল মেহমানের। কেউই আসেনি। সত্যেই তো, খালি ঘরে কেউ আসবেই বা কেন? তাই এবার ঈদে লম্বা ছুটি নিয়ে আয় না একবার বাড়িতে। আমার আর একা থাকতে ভালো লাগছে না।আজ আর নয়। ভালো থাকিস বাবা। ইতি তোর মা।

চিঠিটা পড়ে অশ্রুসজল হয়ে উঠলো আসাদ সাহেবের চোখ। ঝাপসা দৃষ্টিতে একবার তাকালেন মফিজের দিকে। মফিজ বললেনঃ দেখুন ভাই, যান্ত্রিকতা আর উন্নত জীবন-মানের আশায় মানুষ শহরে পাড়ি জমায়। আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। গ্রামে আপনার মাকে একা রেখে গিয়েছিলেন। একবারও কি মনে পড়েনি তার কথা? একমাত্র ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে তিনি তো খুব সুখেই ছিলেন। কিন্তু আপনার বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে আমাকে তার কষ্ট বোঝাতেন। এই চিঠিটা লেখার পর তিনি আমার হাতে দেন। বিভিন্ন কাজের ভুলে আপনাকে আর চিঠিটা পৌঁছে দেওয়া হয়নি। এজন্য অপরাধবোধ হতো। সত্যি বলতে কি ভাই, আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মা-বাবা। তবে আমরা তা বুঝিনা। একটি গাছ যেমন ফুল-ফল, অক্সিজেন আর নিজের ছায়া দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি পিতা-মাতাও তাদের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে- এমনকি জীবন দিয়ে হলেও সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখেন। আর সন্তানদের উদাহরণ দিতে গেলে বলবো, আমরা হলাম পোষাপাখি। পোষাপাখিকে তার মনিব খাইয়ে-পরিয়ে বড় করে কোনো দিন খাঁচা খুলে দিলেই সে ওড়ে পালিয়ে যায়, মনিবের কথা আর একটুও চিন্তা করে না। এ রকমই হলো মানুষের জীবন। আজ তবে আমি যাই, পরে দেখা হবে। এই বলে চলে গেল মফিজ।আসাদ চৌধুরী ভাবছেন, আমরা মা-বাবার ঋণ পূরণে অক্ষম। কত মূল্যবান সম্পদই না ছিলেন তাঁরা। তাঁদের দেখাশোনা করি নি। আর আমার জীবনে অর্জন করা গাড়ি-বাড়ি, সহায়-সম্পদ তো মা-বাবার কাছে তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ।

মতামত