হাওরের কৃষক হতাশ সরকারের সিদ্ধান্তে

অনলাইন ডেস্ক: সুনামগঞ্জ জেলায় গেল বছর ধান উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ টনেরও ওপরে। অথচ সরকারিভাবে ধান কেনা হয়েছে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টন। কৃষকরা সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধানই দিতে পারেননি। এবারও একই আলামত দেখা যাচ্ছে। ধান কেনার জন্য জেলা ধান ক্রয় কমিটির চাহিদাই গেছে মাত্র ৩০ হাজার টন। এ অবস্থায় ধান বিক্রি নিয়ে আগে থেকেই হতাশ জেলার কৃষকরা।

হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদনকারী একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, তারা সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করতে পারবেন এমন আশা ছেড়েই দিয়েছেন। বিশ্বম্ভরপুরের রাধানগরের কৃষক কফিল আহমদ বলেন, দেড় হাজার মণ ধান পাই। গত বছর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা খাদ্যগুদামে ধান কেনা হয়েছে ৩০০ টন। সেই ধান ইউনিয়নভিত্তিক কৃষকদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমার ফতেহপুর ইউনিয়নের ভাগে যে ধান পড়েছে, সেটি একা আমি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি করলেও আমার চাহিদা মিটবে না। সে জন্য আমি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান দেওয়ার চেষ্টাও করিনি।

দিরাইয়ের রাজানগরের কৃষক আবদুস ছাত্তার বলেন, ‘গত বছর এক হাজার মণ ধান পাইছি। এক মণ ধানও সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি করতে পারিনি। সামান্য পরিমাণে ধান কেনে খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ, তাও দেয় টাউট-বাটপাররা। তারারে  গিয়া ধরতাম, এর পরে সামান্য ধান দিতাম, ইটাত আমি গেছি না। ইবার সরাসরি দিবার চেষ্টা করমু, নাইলে কিতা করা যাইব, গতবারের লাখান কমদামে বেচা লাগব।’ সুনামগঞ্জ সদর উপেজলার সৈয়দপুর  গ্রামের কৃষক নাদীর শাহ বলেন, ‘আমি নিজে যেমন কৃষক, অনেক দিন হয় কিছু ধান কেনাবেচাও করি। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে যেভাবে বা যে পরিমাণ ধান কেনা হচ্ছে, কৃষকরা জিন্দেগিতেও (সারাজীবনেও) সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করতে পারত না। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে কৃষকরা ধান নিয়ে গেলে কম শুকনা, চিটা ইত্যাদি বলে বিদায় করা হয়। কৃষকরা গুদামের আশপাশে ধান শুকানোর সুযোগও পায় না। কিন্তু প্রভাবশালীরা কম শুকনা ধান নিয়ে গেলে সরকারি গুদাম কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই গুদামের সামনে শুকানোর ব্যবস্থা করে দেয়।’

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার সমকালকে বলেন, সুনামগঞ্জে গেল বোরো মৌসুমে পাঁচ লাখ টন ধানের কেনাবেচা হয়েছে। অথচ সরকার কিনেছে সাড়ে সাত হাজার টন ধান। তাও মে মাসের মধ্যভাগে গিয়ে ধান কেনা হয়েছে। চাল কেনা হয়েছে আগে। এগুলো হাস্যকর, ধান আগে, না চাল আগে- এটিও কি খাদ্য বিভাগ বা সংশ্নিষ্টদের বোঝাতে হবে। চাল বেশি কেনা হয় এবং আগে কেনা হয় কার স্বার্থে, জনগণ ঠিকই বোঝে।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, জেলায় ধান গুদামজাতকরণের ক্যাপাসিটির কথা বলে কম ধান কেনার কথা বলা হয়ে থাকে। আমরা মনে করি, বোরো ধানের অঞ্চল থেকে এ মৌসুমে ধান কিনে যেখানে এই মৌসুমে ধান কম হয়, সেসব জেলার খাদ্যগুদামে ধান সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সরকারের ধান কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে, না হয় ধানের বাজারমূল্য বাড়বে না।

জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, গত বছর ৮ মে থেকে ধান কেনা শুরু হয়েছিল। চাল ১৫ হাজার টন কেনার বরাদ্দ হয়েছিল। কেনা হয়েছিল ২৬ এপ্রিল থেকে। ধান আগে না কিনে চাল কেন আগে কেনা হলো- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি সরকারি সিদ্ধান্ত, আমরা কেবল কার্যকর করেছি।’

তিনি জানান, সারাদেশের বিভিন্ন ক্রয়কেন্দ্র থেকে সরকার এবার দেড় লাখ টন ধান কিনবে। প্রতি কেজি ধান কেনা হবে ২৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ধান এক হাজার ৪০ টাকা কেনা হবে। চাল আতপ ৩৫ টাকা এবং সিদ্ধ কেনা হবে ৩৬ টাকা কেজিতে। সুনামগঞ্জে কত টন ধান-চাল কেনা হবে, তা এখনও নির্ধারণ হয়নি।

জেলা ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, সুনামগঞ্জ থেকে কমপক্ষে ৩০ হাজার টন ধান কেনার অনুরোধ জানিয়ে গত ১৭ এপ্রিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব স্যারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, এবার ধান কেনার বরাদ্দ বাড়বে।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হাওর এলাকায় একফসলি জমি বেশি। উৎপাদনের পরিমাণও বেশি, এসব বিবেচনায় এ অঞ্চল থেকে ধান বেশি কেনার জন্য খাদ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাব। রোববারেই এ বিষয়ে আমি আলোচনা করব।’

প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জে এবার বোরো ধানের চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে আট লাখ ৭৫ হাজার টন বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি কর্মকর্তা বশির আহমদ।

২৮ এপ্রিল বিক্ষোভ-মানববন্ধন :কৃষকদের কাছ থেকে লাভজনক মূল্যে সরাসরি ধান ক্রয় নিশ্চিত, ইউনিয়নে ইউনিয়নে ক্রয়কেন্দ্র করা ও পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান কেনার দাবিতে ২৮ এপ্রিল হাওরাঞ্চলের সব উপজেলায় মানববন্ধন এবং উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি আহ্বান করেছে বাংলাদেশ কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ।সূত্র-সমকাল

মতামত