সংস্কৃতির পতাকা হাতে তারুণ্য

অনলাইন ডেস্ক: পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে কথা হচ্ছিল তরুণদের সঙ্গে, যারা সংস্কৃতির পতাকা হাতে নিয়ে বাঙালির জয়গান গেয়ে চলেছেন। তাদের কেউ দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে সুরের ঝঙ্কার তুলছেন। কেউ আবার কবিতার ছন্দে তুলে ধরছেন বাংলা সংস্কৃতিকে। বয়সে তরুণ হলেও কেউ কেউ ফোকলোরের মতো কঠিন বিষয় পড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার সুর ছড়িয়ে দিতে কাজ করে চলেছেন।

কবিতায় সব সময়ই অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশের কথা বলেছেন কবি মুজিব ইরম। এর কারণ কী- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, স্বাধীনতা-উত্তর এক অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে তাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে। তিনি বেড়ে উঠেছেন প্রকৃতি ও মানুষের উদার সান্নিধ্যে। নানা বর্ণের, ধর্মের, ভাষার ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠায় ধর্মের বাড়াবাড়ি দেখেননি কোথাও। তিনি বলেন, যে ঘরে জন্মেছিলাম, যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলাম, সেখানে মানুষ ধর্ম উদার হতে শিখিয়েছিল। ধর্মের চেয়ে সংস্কৃতিকে বড় করে দেখেছিলাম, আপন করে নিয়েছিলাম। বেড়ে উঠেছি জলে ও পানিতে, বেড়ে উঠেছি আজান ও উলুধ্বনিতে, ঈদ, মহররম, পূজা-পার্বণে। যে কারণে লেখালেখিতে সর্ব ধর্ম, সর্ব বর্ণ, সর্ব ভাষা এক হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তিনি তার কবিতায় এক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে আনতে চেয়েছেন। গাইতে চেয়েছেন মানুষের গান, মানবতার গান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের শেকড়ের সন্ধান পান শিল্পী রাহুল আনন্দ। সম্পূর্ণ দেশীয় অনুষঙ্গ দিয়ে তৈরি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গানের দল ‘জলের গান’। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। বললেন, তাদের পূর্বপুরুষরা অনেক কিছু রেখে গেছেন। হাজার বছরের যে সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছে, তা তারাই রেখে গেছেন। তারা বাদ্যযন্ত্র বানাতে সুর বাঁধতেন, তার ওপর কথা বসিয়ে তৈরি হতো গান। তাদের একটা আশীর্বাদ আছে। সে আশীর্বাদের ছোঁয়াটাই তিনি তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বলতে চেয়েছিলেন, ‘অন্য কোনো দিকে ঝুঁকে যাওয়ার কিছু নেই। তুমি নিজেই শক্তিশালী।’ তিনি বলেন, স্বপ্নেও ভাবিনি বৃদ্ধ থেকে শিশুরা এসব গান পছন্দ করবেন। এমনকি এসব গান গাওয়ার সময় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও সঙ্গে সঙ্গে নাচে, গায়- এটাও বোধহয় পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ।

বাঙালি সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম পটচিত্র। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা পটচিত্রে দেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে কাজ করে চলেছেন শিল্পী পটুয়া নাজির হোসেন। এ কাজে তিনি সঙ্গী করে নিয়েছেন বাঘকে। যার জন্য তিনি জাপান-বাংলাদেশ গুডউইল অ্যাম্বাসাডরও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এত কিছু ফেলে পটচিত্র কেন- এ প্রশ্ন ছিল ‘টাইগার নাজিরে’র কাছে। বললেন, তিনি তার শেকড়কে ভুলতে চান না। পটচিত্র শেকড়ের কথা বলে। সেই শেকড়ের কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিতেই তার পটচিত্রে কাজ করা, যাতে মূলত নিজের মনের ভাবনটাই উপস্থাপন করেন তিনি। এ কাজে তিনি বাঘকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কারণ, বাংলার বাঘ গর্বের ও বিজয়ের মূর্ত প্রতীক। গ্রামবাংলার গানগুলো নতুন করে গেয়ে চলেছেন লালন ব্যান্ডের সুমি। তিনি বললেন, ‘দিনের পর দিন মানুষ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। হন্যে হয়ে ছুটছে। তারপরও খোঁজ নিলে দেখা যাবে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও মাটির সুর-সুধা তাদের কাছে টেনে নিচ্ছে। তাই যান্ত্রিক জীবনে এক পসলা বৃষ্টির পরশ এনে দিতে শুনিয়ে যাচ্ছি চিরায়ত লোকগান। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে সঙ্গীতায়োজনের ভিন্নমাত্রা তুলে ধরলেও লোকগানের নির্যাস রেখে দিচ্ছি। কারণ একটাই, হাজার বছরে যার আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি, সেসব গান চিরকাল শ্রোতার মনে অনুরণন তুলবে।’

২০০৫ সাল থেকে পোশাকে দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে ফ্যাশন হাউস দেশাল। এর প্রধান নকশাকার ইশরাত জাহান শোনালেন দেশালের গল্প। বললেন, “শুরু থেকেই বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে পোশাক তৈরি করছে দেশাল, যাতে একজন শহুরে মানুষকে তার শেকড়ের গল্পটা জানান দেওয়া যায়। এসব পোশাককে বলা যায় ‘চলন্ত ক্যানভাস’। সেই সঙ্গে রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়।” এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজন সম্পর্কে তিনি বললেন, দেশালের এবারের পোশাকগুলোতে এ ভূখণ্ডের মানুষদের যাপিত জীবনের গল্প বলা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে মেহেদী উল্লাহ কাজ করেছেন পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। কবিতায় তুলে ধরেছেন আপন মনের কথা। বর্তমানে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নিজের লেখায়, নিজের কর্মে তিনি কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরেন- এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘একজন লেখক হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশে বিরাজিত বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্র বা সমন্বিত এক সংস্কৃতিকে বুঝতে পারা এবং সে অনুযায়ী লেখায় উপস্থাপন করতে পারা বিরাট ঘটনা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানুষের ভাষা, জীবন-যাপন, ধর্মীয় আচার, উৎসব ইত্যাদি গ্রাম ও শহরভেদে যা, তাই এ দেশের সব মানুষের সংস্কৃতি; যা ছিল কিন্তু এখন নেই অথবা যা লেখায় ছিল, জীবনে ছিল না, যা থাকবে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু থাকল না তার কিছুই এখানকার সংস্কৃতি নয়। ফোকলোর পড়া ও পড়ানোর সুবাদে এখানকার সংস্কৃতির এমন সব দিক বুঝতে পারছি প্রতিনিয়ত, যা শাস্ত্রের বাইরের এক জগৎ, লোকমানুষের নিজ অভিজ্ঞানজাত জীবনব্যবস্থা, নিজের উৎপাদিত জীবনের অর্থ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অমিশ্র সংস্কৃতি।’

মতামত