শত হারিয়ে যাওয়া বিকেলের গল্পে!

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি, তারা অনেককিছু ছেড়ে ছুড়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছি। আমরা হারিয়েছি আমাদের শৈশব। একদম আদি ও অকৃত্রিম শৈশব। অকৃত্রিম বলছি, কারণ আমরাই হলাম শেষ প্রজন্ম যাদের শৈশব মোবাইল নামক দৈত্য গিলে খেতে পারেনি। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা জীবনের খুব কাছে যেতে পেরেছি। আমাদের শৈশব এত নিখাঁদ সুখ আর প্রাপ্তিতে পূর্ণ ছিল যে আমাদের বুক থেকে এখনো শৈশবের সেই সুবাস সরেনি।

আমাদের হৃদয় অনেককিছু হারানোর বেদনায় সিক্ত৷ আমাদের বিকেল আড্ডাগুলো ছিল নিষ্পাপ। আমাদের খেলাগুলো তখনো জুয়ার দখলে যায়নি। আমরা ক্রিকেট খেলতাম, ফুটবল খেলতাম। বড় মাঠে। নির্বিঘ্নে। আমাদের সে মাঠে এখন দালান উঠে গেছে। তাই বর্তমান প্রজন্ম সেখানে শর্টপিচ ক্রিকেট খেলে৷ ছোট গোলবারের অলিম্পিক ফুটবল খেলে। আর প্রতিটি বলে এবং প্রতিটি গোলে জুয়া খেলে। আমরা ক্রিকেটের স্ট্যাম্প বানানোর জন্য পাহাড়ে যেতাম ছোট গাছ কেটে আনতে।

এখন ওরা রেডিমেড স্ট্যাম্প কিনে আনে। মসৃণ আর নিখুঁত। আমাদের বৈকালিক আড্ডায় ধূমপায়ী কেউ ছিল না। আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল খুবই সাদাসিধে। আমাদের জীবনের মতই। আর এখন, বিষাক্ত ধোঁয়ার দখলে থাকে তাদের আড্ডা। আলোচনার বিষয়, রাজনীতি, নারীনীতি, আরো কত কী! আমরা গাছের সবগুলো ডালে পাখির মত বসে থাকতাম। আর গল্প শোনতাম। আমাদের গল্প শুরু হত, এক দেশে ছিল এক রাজা….. দিয়ে। গল্প আমরা মুগ্ধ হয়েই শোনতাম। গল্পের রসে কখনোবা হেসে কুটিকুটি হতাম। আমরা জ্যোছনা রাতে ঘরে থাকতে পারতাম না।

পূর্ণচাঁদ আমাদের ডাকত। সে ডাক উপেক্ষা করার শক্তি আমাদের ছিল না। সে ডাকে সাড়া দিতাম বাড়ির দরজা আস্তে আস্তে খুলে, গুটিগুটি পায়ে। খুওওব ধীরে, নিরবে। আমরা সে ফকফকা চাঁদের আলোয় লুকোচুরি খেলতাম, গোল্লাছুট খেলতাম। আরো কত গ্রাম্য খেলা খেলতাম বাড়ি থেকে কেউ এসে কানে ধরে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। আমরা হুট করেই দলবেঁধে মাছ ধরতে যেতাম বড়শি নিয়ে। আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা খেলা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় রেষারেষি করেছি। আমাদের মাঠের পিচ তারা খুঁড়ে দিয়েছে, আমরা তাদের পিচ খুঁড়ে দিয়েছি। আমাদের শৈশব আবর্তিত হত এসব পাড়া কূটনীতি নিয়ে।

টুর্নামেন্ট ডাকতাম আমরা। কমিটির টিম থাকত। জিতিয়ে দিতাম। ধান কাটার পর নরম মাটিতে ডাঙুলি খেলতাম। উদ্দেশ্য? মাঠ শক্ত করা। সামনে তখন আমাদের অনেক কাজ। পিচ বানাতে হবে মাটি শক্ত হয়ে এলে। গরু-ছাগল নামতে দিতাম না মাঠে এই কয়দিন। রাখতাম কড়া নজরদারি। কোদাল দিয়ে পিচ বানাতাম। লবনের মাঠ থেকে নিয়ে আসতাম বড় ডাম্বেল। সে ডাম্বেল চালিয়ে পিচকে করতাম মসৃণ। মাঠ প্রস্তুত! এবার দীর্ঘ খেলার প্রস্তুতি। ব্যাট,বল, স্ট্যাম্প ততদিনে ব্যবস্থা করে ফেলেছি। প্রতিদিন খেলা, ঝগড়া। প্রতিদিন এক বুক সুখ নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরতাম সন্ধার পর ভয়ে ভয়ে। কারণ প্রতিদিনই আমাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে যেত। মাগরিবের নামাজ না পড়েও, অযু করে নামাজ পড়ে এসেছি এমন ভাব ধরে বাড়ি ফিরতাম।

মা’র জিজ্ঞাসায় থতমত খেয়ে সত্যটা বলে দিতাম। বকা, পিঠুনি খাওয়ার এত বেশি সৌভাগ্য আর কাদের হয়েছে আমাদের মত? এই প্রজন্মের তোমাদের জন্য আমার খুব দুঃখ হয়। আমি নিজ চোখে দেখছি একটি গোটা প্রজন্মের শৈশব এভাবে গুম হয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রাণ নাই, ভয় নাই, নাই নিষ্পাপ সুখ। স্মার্টফোন তোমাদের বিকেল খেয়ে ফেলেছে। তোমাদের সকাল, দুপুর খেয়ে ফেলছে সদ্য চালু হওয়া নষ্ট ছাত্ররাজনীতি। যেখানে ভাইয়ের পিছনে শ্লোগান দিতে হচ্ছে ক্লাস সিক্সে পড়া ছেলেটাকেও। কী নির্মম! কী নৃশংস! তোমাদের নিয়ে আমি খুব বেশি হতাশ ছিলাম। তোমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রিয় দেশটাকে নিয়ে। কিন্তু, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন আমার সে হতাশায় আশার বীজ বপন করেছে। তোমাদের যে প্রাণশক্তি, যে একরোখা মনোভাব তাকে আমি শ্রদ্ধা করছি। কিন্তু, এও তোমাদের জানিয়ে রাখছি- তোমাদের আরো অনেক কিছুই জানতে হবে।

জীবনকে জানতে হবে, মানুষকে জানতে হবে। নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া আমাদের কাছে আসতে হবে তোমাদের। কারণ আমরাই এদেশের মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে বেড়াচ্ছি। আমাদের হাত ধরে দেখ। গ্রামের সতেজ অনুভূতি টের পাবে। যে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়বে তোমাদের দেহে। তোমাদের সাহস, ঘাড়ত্যাড়ামি আর আমাদের জীবনবোধ যেদিন একসাথে মিলবে, সেদিন এ দেশের বুকে সত্যি সত্যিই আঠারো নেমে আসবে। কাজেই আমাদের সাথে মিশে, মাটির ঘ্রাণ নিয়ে নাও। শৈশবের ঘ্রাণ নিয়ে নাও। জেনে নাও মানুষের শৈশব, কৈশোর কত পবিত্র হতে পারে। কত নিখাঁদ হতে পারে। সে শৈশবে তোমাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আসো…

মতামত