ফিরে দেখা বরুড়ার ১৯৭১

ইলিয়াছ আহমদ, বরুড়া: ১৯৭১ সালে পশ্চিমা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে বিশ্বের বুকে লাল সবুজ পতাকা চিনিয়ে এনেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। ঐ সময় বাংলাদেশ যাতে স্বাধীন না হয়, এদেশের কিছু গন্ড মুর্খরা ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানিদের পক্ষে। ইতিহাসে তারা আজ রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত।

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ১৯৭১ সালে নুরুল ইসলাম মিলনের নেতৃত্বে বিএলএফ বেলায়েত হোসেন ও ফিরোজ আহমদ এর নেতৃত্বে এফএফ এ দুইটি বাহিনী সক্রিয়ভাবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করে। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হলে ও উপজেলার পয়ালগাছা ইউনিয়নের বটতলীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয় ৭১ সালের ১৮ ই আগষ্টে। এতে শহীদ হন, দুঘই গ্রামের কাজী আরিফুর রহমান, শিংঘুরিয়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, আড্ডা গ্রামের মমতাজ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, কাকৈর তলা গ্রামের জয়নাল আবেদীন। বটতলী সম্মুখ যুদ্ধের একপর্যায়ে যুদ্ধের রৌনকৌশল হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা পয়ালগাছা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালিন প্রধান শিক্ষক মোরতাজুল হক চৌধুরী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আবদুল হক, স্থানীয় আরিফুর রহমান, তাজুল ইসলাম সহ সাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদেরকে এটাক করে সামনে ফিছনে বন্দুকের নল রেখে মোদাফ্ফরগঞ্জ ও হাজিগঞ্জে পালিয়ে যায়। উল্লেখিত ব্যাক্তিদের কে বাচাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি কোন সৈন্যকে মারতে পারেনি। বিবিসি নিউজ ও ভারতের পত্রিকায় এ খবরটি প্রচার করা হয়। কাজী আরিফের আরেক ভাই কাজী বাবলু চান্দিনায় শাহাদাৎ বরণ করেন। বরুড়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের দুই গ্রুপেরই ক্যাম্প ছিলো আদ্রা ইউনিয়নের পেরপেটি গ্রামের আমিনুল ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়িতে।

বরুড়ার মুক্তিযোদ্ধ অংশগ্রহনকারী ছেলেরা প্রথমে ভারতের সোনামুড়া, কাঠালিয়া, বক্সাসনগর ও আগরতলায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষন সহ নানাহ প্রশিক্ষন নিয়ে পুনরায় এলাকায় চলে এসে যুদ্ধে জাপিয়ে পড়তো। ভারতের ৪টি প্রশিক্ষন কেন্দ্রে বরুড়ার কৃতি সন্তান দেননগরগ্রামের এলাহী বক্স চেয়ারম্যান, দুঘই গ্রামের কাজী আলী আকবর, হরিপুর গ্রামের মোঃ কাদির মিয়া চেয়ারম্যান ও মন্দুক গ্রামের মোঃ মহসিন মিয়া প্রশিক্ষনের দায়িত্ব পালন করতেন। স্বাধিনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করে বরুড়া গ্রামের হাবিলদার মোঃ আবদুল মতিন শাহাদাৎ বরণ করলে ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো স্বীকৃত পায়নি। যুদ্ধ করে ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি ভবানীপুর গ্রামের সৈয়দ রেজাউল হক রেজু, গোয়ালীয়া গ্রামের মাহবুবুর রহমান ভূইয়া, অর্জুনতলা গ্রামের মৃত- খলীলুর রহমান ভূইয়া, সিংগাচৌ গ্রামের মৃত-ফকরুজ্জামান ভূইয়া, কসামী গ্রামের মৃত- আবদুল মন্নান মেম্বার, বরুড়া গ্রামের মৃত- আবুল বাশার, দেননগর গ্রামের মোঃ রমিজ উদ্দিন, ইলাশপুর গ্রামের মাওলানা মোঃ আব্বাস আলী । পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায়নি এলাকার অসংখ্য মা বোনদের ইজ্জত, অনেক প্রতিষ্ঠান ও অনেকের বাড়ি ঘর। ঝলম উচ্চ বিদ্যালয় কে হানাদার বাহিনিরা বোমা মেরে উরিয়ে দেয়। আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় বরুড়া গ্রামের সাহেব বাড়ি, গিয়াস উদ্দিন মিয়ার বাড়ি, সুলতান মিয়ার বাড়ি, কালা মিয়ার বাড়ি, শাকপুর গ্রামের পনগাজীর বাড়ি, তলাগ্রামের ভাওয়াল বাড়ি, বারিক মিয়ার বাড়ি, শুশুন্ডা গ্রামের ইসমাইল মিয়ার বাড়ি, অর্জুনতলা গ্রামের দেওয়ান মেধা উদ্দিনের বাড়ি, লতিফপুর ডাঃ আঃ রহিমের বাড়ি। ঐ সময় পাকহানাদার বাহিনির হাতে নির্মমভাব খুন হওয়ার পরে ও যুগেশ কেরানি, সুরুন্দ্র নাথ দেব, তার মাতা সুবুদার সুন্দরী দেব নাথ, তার স্ত্রী যসধা সুন্দরী দেব নাথ ও অর্জুনতলা গ্রামের আবদুল বারিক সহ তারা কেউ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদ মমতাজ উদ্দিন শহীদ স্বীকৃতি পেলে ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবদুল হাকিম এম এ, বরুড়া হাজী নোয়াব আলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামছুল হুদা, বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য ডাঃ আবদুর রহিম, অর্জুনতলা গ্রামের দেওয়ান মেধা উদ্দিন , আড্ডা গ্রামের আলী আকবর চেয়ারম্যান সহ অনেকে প্রসংশার দাবিদার। শামছুল হুদা মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ছিলেন, তিনি ১৯৭৬-৭৮ সাল বরুড়া থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও একই সময় কুমিল্লা জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন, অথছ তিনিই পাননি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি। সিংগাছর গ্রামের ফকরুজ্জামান ভূইয়া, অর্জুনতলা গ্রামের খলিলুর রহমান ভূইয়া কে ৭১ সালে পাকিস্তানিরা ক্যান্টমেন্টে আটক রেখে নির্যাতন করে, তারা ও স্বীকৃতি পায়নি মুক্তিযোদ্ধার। মেজর চেঙ্গিস খান আড্ডা বাজারে আবদুল লতিফ নামের এক মুক্তিযোদ্ধাকে গাছে ঝুলিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত গুলি করে হত্যা করে। এ বর্ববর বাহিনী ঐ সময় আবদুল মান্নান নামের আরো একজন লোক কে হত্যা করে খালে বাসিয়ে দিয়ে, আড্ডা বাজের আগুন লাগিয়ে দেয়। বরুড়া পশ্চিম বাজার থানার উত্তর পার্শে হানাদার বাহিনীর সহযোগীরা (রাজাকার) টরচার সেল খুলে সাধারণ লোকজনকে এনে নির্যাতন করতো। ঐ সময় বরুড়া বাজারের বিভিন্ন দোকানে লোটপাটের ঘটনা ঘটেছিলো। নানাহ নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ ই ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বরুড়া উপজেলা স্বাধীন হয়। তৎকালিন কমান্ডার নুরুল ইসলাম (সাবেক সংসদ সদস্য) জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তার সহকর্মীদের নিয়ে। সেদিন থেকে বিজয়ের ধ্বনী উড়ে বরুড়ার বিভিন্ন গ্রামে।

মতামত