ধানি জমিতে পাথরভাঙা মেশিন

অনলাইন ডেস্ক: নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না পাথরভাঙার কলগুলোকে। আদালতের রায়েও কাজ হয়নি কোনো। এখনও আগের মতোই পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে সিলেট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ভাঙা হচ্ছে পাথর। যে যার মতো করে ধানি জমি ছাড়াও সড়কের পাশে, বাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসার সামনেই গড়ে তুলেছেন স্টোনক্রাশার মিল। এ ছাড়া সরকারি জমি দখল করে এসব মিলের কার্যক্রম চললেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এ নিয়ে। পাথরভাঙার কল স্থাপনের কারণে কৃষি-প্রকৃতি হারানোর আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা।

সরেজমিন জৈন্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামপুঞ্জি, মোকামবাড়ী গ্রাম, আদর্শগ্রাম ও আসামপাড়ায় শতাধিক স্টোনক্রাশার মিল স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে সেসব গ্রামের হাজার হাজার মানুষ রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। একইভাবে জৈন্তাপুর ক্যাপ্টেন রশীদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, ক্যাপ্টেন রশীদ আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য স্টোনক্রাশার মিল। আর এসব মিল থেকে সৃষ্টি হচ্ছে শব্দ ও পরিবেশ দূষণ।

একইভাবে গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং এলাকার তামাবিল, সোনাটিলা এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় সারি বন বিটের জায়গায় শতাধিক অবৈধ ক্রাশার মেশিন বসানো হয়েছে। জাফলং বন বিটের অফিস থেকে মাত্র ৫০ গজের মধ্যে হলেও কোনো নজরদারি নেই এখানে।

সিলেট তামাবিল মহাসড়কের পাশে গ্রিন পার্কের গাছ কেটে মিল মালিকরা ক্রাশার মেশিন স্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে দখল করা হয়েছে বন বিভাগের প্রচুর জমি। জাফলং গ্রিন পার্কের সামনে এসেই পর্যটকদের নাকে রুমাল চেপে যেতে হয় জাফলংয়ের সৌন্দর্য ঘুরতে। একইভাবে কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া পাথর কোয়ারি ঘিরে গড়ে উঠেছে একাধিক ক্রাশিং মিল। এ ছাড়া সিলেট সদর উপজেলার ধোপাগুল, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্রাশার মিল।

ধোপাগুল এলাকায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ঘিরেই বেশ কয়েকটি ক্রাশার মিল গড়ে উঠেছে। এসব মিলের ধুলোয় ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে রানওয়ের আশপাশের এলাকা।

যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা এসব কল পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করায় শহর, পৌরসভা, উপজেলা সদর, গ্রোথ সেন্টার, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫০০ মিটার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ১০০ মিটার এবং প্রধান সড়ক-মহাসড়কের ৫০ মিটারের মধ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ির পাশে কোনো স্টোনক্রাশার মিল চালু না রাখার বিধান দিয়ে প্রণয়ন হয় ‘স্টোন ক্রাশিং ক্রাশার মেশিন স্থাপন নীতিমালা ২০০৬’। এরপর ২০১৩ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ও স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা (সংশোধিত ২০১৩)’ নামে আরও একটি নীতিমালা করে। অথচ এসব বিধিবিধান মানতে নারাজ সিলেটের স্টোনক্রাশার মিল মালিকরা। তারা যে যার মতো করে যেখানে-সেখানে গড়ে তুলেছেন স্টোন ক্রাশিং জোন।

যত্রতত্রভাবে স্টোন  ক্রাশিংয়ের জোন গড়ে ওঠার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি আদালত একটি রায় দেন। রায়ে বৈধ ক্রাশিং মেশিনগুলোকে একটি জোনে স্থানান্তর এবং অবৈধ ক্রাশিং মেশিন উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। পাশাপাশি আদালত ২০১৩ সালের সংশোধিত স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা বাদ দিয়ে ২০০৬ সালের নীতিমালা অনুসরণ করার কথা বলা হয়। আর এসব বাস্তবায়নে সময় দেওয়া হয় এক মাস। অথচ রায়ের পর পেরিয়ে গেছে দু’বছর। কিন্তু যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়েছে সব।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেটের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার সমকালকে বলেন, ‘কোনো নীতিমালা অনুযায়ী চলছে না এসব মিল। আদালতের রায়টিও আমলে নেওয়া হয়নি। ওই রায়ে ক্রাশিং জোন করে পাথর ভাঙার নির্দেশ থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এতে দিন দিন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার পাল সমকালকে বলেন, ‘এটি একেবারে পরিবেশ আইনের পরিপন্থি। পাথরভাঙার কলগুলো অবৈধভাবে বন বিভাগের জমি দখল করে রেখেছে। পরিবেশের ক্ষতি করে বন বিভাগের জমিতে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরে অবগত করেছি। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে সেটিও আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরেও জানিয়েছি। তারা যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তাহলে আমরা সহযোগিতা করব।’

এ ব্যাপারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দ্বিজেন ব্যানার্জি সমকালকে বলেন, ‘আমরা অবৈধ মিলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে একটি তালিকা পাঠিয়েছি। পাশাপাশি বিদ্যুতের লাইন কাটার জন্য পল্লী বিদ্যুতের কাছেও বলা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন সমকালকে বলেন, ‘পাথরভাঙার মিল আমাদের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। পাথরভাঙার মিলের কারণে যে ডাস্ট তৈরি হয়, সেটি ফসলি জমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পাথরভাঙার ধুলো ধানের পাতার ওপর পড়ার কারণে সূর্যের আলোকরশ্মি সেভাবে ভেতরে পৌঁছায় না। এ কারণে ধান উৎপাদন ভালো হয় না। এ ছাড়া জমির পুষ্টি ক্ষমতা কমে যায়।’

তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পাথরভাঙার কল স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। ক্ষতির দিকটি এখন হয়তো বোঝা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে পুরো এলাকার কৃষি-প্রকৃতি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি অবগত আছি। আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানও চালাচ্ছি। স্টোনক্রাশার মিলগুলোকে একটি জোনে নেওয়ার ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন। সে অনুযায়ী জমিও দেখা হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। সূত্র: সমকাল

মতামত