‘মঞ্চনাটক থেকে অর্থ পাইনি তবুও আমি সন্তুষ্ট’

মামুনুর রশীদ। বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক। তার হাতে গড়া আরণ্যক নাট্যদলের ৪৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি শিল্পকলায় শেষ হয়েছে ‘ক্রান্তির মাদল’ শিরোনামে দুইদিনব্যাপী নাট্যোৎসব। এতে মঞ্চায়ন হয়েছে ‘রাঢ়াঙ’ ও ‘সঙক্রান্তি’। এ দুটি নাটকের রচয়িতা এবং নির্দেশক তিনি।

যে স্বপ্ন নিয়ে ৪৭ বছর আগে আরণ্যকের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হলো?

আরণ্যক পথচলার দীর্ঘ ৪৭ বছর পূর্ণ করেছে। প্রথমত, এটা অনেক আনন্দের। আর স্বপ্ন কখনও পূরণ হয় না। একটা স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পর আবার নতুন করে স্বপ্ন দানা বাঁধে। ছোটবেলায় আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি, বড় হওয়ার পর স্বপ্নগুলো পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্বপ্ন এসে ভিড় করে। ‘নাটক শুধু বিনোদন নয়, শ্রেণি-সংগ্রামের সুতীক্ষষ্ট হাতিয়ায়’- এই স্লোগান নিয়ে দলটি নাটক করছে। আরণ্যকের সব নাটকে মানুষের জেগে ওঠার কথা বলতে চেয়েছি। আমরা কাজটা করে গেছি। সাফল্য-ব্যর্থতার বিচার দর্শকদের হাতেই রইল। 

দীর্ঘ ৪৭ বছর কোনো নাট্যসংগঠন পরিচালনা চাট্টিখানি কথা নয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। দলকে সংগঠিত করার মন্ত্র কী ছিল?

দলকে সংগঠিত রাখার জন্য কমিটমেন্টই ছিল জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসেই আমরা দলের যাত্রা শুরু করেছি। নাটকের ক্ষেত্রে সব সময়ই একটা উত্থান-পতন চলে। যেমন একটি নাটক খুব সফল হলো, একই সময় আরেকটি নাটক সেই ধরনের সাড়া জাগাতে পারেনি। তখন ভেতরে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তখন সবার প্রতিজ্ঞা থাকে, পরের নাটকটি অবশ্যই ভালো করতে হবে। এর মধ্যে থাকে নানা টানাপড়েন। এই টানাপড়েনে অনেকে দলই ছেড়ে দেয়। তবে আমি কখনও হাল ছাড়িনি। সবসময়ই নতুন কিছু কর্মী, নাট্যকার, নির্মাতা, ডিজাইনার সৃষ্টি করেছি। পরে তারাই দলের চালিকাশক্তি হয়েছে। আরণ্যকের অনেকেই এখন পুরোপুরি নির্দেশনা দিতে পারেন। একজনের পর আরেকজন তৈরি হচ্ছেন। এতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। 

‘ক্রান্তির মাদল’ উৎসব কতটা সফল হয়েছে? 

উৎসবে মঞ্চায়িত হয়েছে আমাদের দুটি নাটক। নাটক দুটির প্রদর্শনী বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। এবার উৎসবকে ঘিরে মঞ্চে ফিরছে। নাটক দেখতে বেশ দর্শক সমাগম হয়েছে। বর্তমানে যেটা কম দেখা যায়। উৎসবকে ঘিরে নিজেদের একটা হিসাব-নিকাশও হয়ে গেল। যে নাটকগুলো বহু বছর ধরে চলছে, সেই নাটকগুলোর আবেদন বর্তমানে আছে কি-না- আমরা সে পরীক্ষাটা দিয়ে দেখলাম। দর্শকের স্বতঃস্ম্ফূর্ত উপস্থিতি দেখে মনে হলো, এই নাটকের আবেদন এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। উৎসবের স্লোগান ছিল ‘বারবার জেগে উঠি মাদলের শব্দে’। এই আয়োজনে আমরা মানুষের জেগে ওঠার লড়াইয়ের গল্পই বলেছি। 

মঞ্চনাটকের সংকট ও সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখেন? 

মঞ্চে অনেক সংকট রয়েছে। আরও আধুনিক মঞ্চ দরকার। শুধু শিল্পকলাকেন্দ্রিক মঞ্চ দিয়ে হবে না। এটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। উত্তরা, বনানী, গুলশান, মিরপুর, ধানমণ্ডিতে কোনো স্থায়ী মঞ্চ নেই। পুরান ঢাকার যে মঞ্চ ছিল, এগুলো এখন আর অভিনয় উপযোগী নয়। একটি দল যদি মাসে ৮-১০টি শো করতে পারত, তাহলে সার্বক্ষণিক কর্মী তৈরি হতো। মঞ্চের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা খুব দরকার। পৃথিবীর সব দেশে মঞ্চের পৃষ্ঠপোষকতা সরকারই করে। পশ্চিমবঙ্গে মঞ্চশিল্পীদের সম্মানীর ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি মঞ্চনাটক নিয়েও ভাবতে হবে। নাটকের যে লোকশিক্ষা হয় এটারও প্রয়োজন আছে। মঞ্চনাটক মানুষের রুচিবোধকে উন্নত করে। আর সম্ভাবনার কথা  যদি বলি তাহলে বলব হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বিনা পারিশ্রমিকে মঞ্চে কাজ করছে। তার নিজেদের ভেতরকার তাগিদ দিয়ে এই শিল্পের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। প্রতিদিন তো একটি ভালো শিল্পকর্ম হবে না। বছরে যদি পাঁচটি ভালো নাটক হয়, এটিই যথেষ্ট। সেই কাজটা হচ্ছে। দেশে এখন ভালোমানের মঞ্চনাটক হচ্ছে। আমি গ্রামে গিয়ে দেখেছি, যখন একটি মঞ্চনাটক হচ্ছে দর্শক সেখানে অন্যরকম আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন। এটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। 

দেশে নাট্যচর্চা কেমন হচ্ছে? 

আমাদের দেশে নাট্যচর্চা আগেও ছিল। কিন্তু সেটা অনিয়মিত। এখন পাড়া-মহল্লা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও মঞ্চনাটক হচ্ছে। মঞ্চনাটক একটা পেশাদারি পর্যায়ে চলে গেছে। যদিও পেশা হিসেবে কেউ নিতে পারছে না। কিন্তু মানটা হচ্ছে পেশাদারিত্বের মতোই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নাটক এখন অনেক উঁচুমানের। আমাদের দেশে যখন কোনো উৎসবে বিদেশিরা নাটক দেখতে আসেন তখন তারা খুব অবাক হন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। কলকাতায় ২০০ বছর ধরে নিয়মিত নাট্যচর্চা হচ্ছে। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাত্র ৪৭ বছরে অনেকটা এগিয়ে রয়েছি। কলকাতার মানুষদের মুখেই শোনা যায় নাটকের রাজধানী এখন কলকাতা নয়, ঢাকা। তখন আনন্দে বুক ভরে যায়। 

কখনও কি মনে হয় মিডিয়ার প্রভাবে থিয়েটার হারিয়ে যাবে?

কখনোই না। থিয়েটার আমাদের এক বিরাট শক্তি। কোনো দিনই মঞ্চের আবেদন হারাবে না। মানব জাতির ইতিহাসে মানুষ যখন শিল্পভাবনায় তাড়িত হলো, তখন থেকেই থিয়েটারের ক্রমবিকাশমান ধারায় নবচেতনার উন্মেষ ঘটে। প্রতিমুহূর্তে সৃষ্টি হতে থাকল এক বিস্ময়কর জাগরণ, যা থেকে আমরা এখনও উত্তাপ গ্রহণ করছি। থিয়েটার সবসময় প্রাণের কথা বলে, জীবনের কথা বলে, বিদ্রোহের কথা বলে, তাই নাটক হয়ে উঠেছে মানুষের কণ্ঠস্বর। আমাদের নাট্য সংস্কৃতি আছে। সেখানে থিয়েটার হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসেও তাই। যতদিন পৃথিবী থাকবে, ততদিন থিয়েটার থাকবে। সেই আড়াই হাজার বছর আগে থেকে চলছে। এর মধ্যে রেডিও টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে এসেছে। তারপরও এটি টিকে আছে। 

জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কখনও ভেবেছেন?

আমার প্রাপ্তি অনেক। সত্তর দশকে যখন শুরু করেছিলাম, তখন স্বপ্নেও ভাবিনি নাটক দিয়ে এত কিছু করতে পারব। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক দেশ দেখা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় নাটক নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার পেয়েছি। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, মঞ্চনাটক থেকে অর্থ পাইনি। কিন্তু অন্য মিডিয়া থেকে যা উপার্জন করি, তা দিয়েই সংসার চলে। এটা নিয়েই আমি যথেষ্ট সন্তুষ্ট।

মতামত