তোপের মুখে গণফোরামের দুই এমপি

অনলাইন ডেস্ক: দলীয় নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন গণফোরামের দুই নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খান। দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়ে শপথ নেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক বক্তব্য দেওয়ায় এ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। 

দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মতামত দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গণফোরাম। সোমবার সন্ধ্যায় দলের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের মনোনয়নে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ধানের শীষ এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত এ দুই সংসদ সদস্য শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে সোমবার গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।

এ বিষয়ে গণফোরামের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জোটগতভাবে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও বহাল আছে। ঐক্যজোটের নেতারা বলেছেন, ড. কামাল হোসেন দেশে ফিরলে শপথসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হবে।

আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় দলের কাউন্সিলের নিয়মিত প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে অংশ নিতে সোমবার সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খান কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন। সেখানে দলটির ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজ ও যুব গণফোরামের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন তারা। এ সময় নেতাকর্মীরা ‘দালাল দালাল’ বলে স্লোগানও দেন। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সেখানে অল্প কিছু সময় অবস্থান করে বের হয়ে যান তারা।

বৈঠকে দুই সাংসদের বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে দুই নেতাকে সতর্ক করে একটি চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকের পর গণমাধ্যমে সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে গণফোরামের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। 

দলের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বিবৃতিতে বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিদের শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল আছে। সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে গণফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো সংসদ সদস্যের শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও বহাল আছে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য সুদৃঢ় ও অটুট আছে। গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংসদে যোগ দিচ্ছেন- এ ধরনের সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যা অসত্য ও ভিত্তিহীন।

এ বিষয়ে গণফোরাম নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে তিনি খুব শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। গণফোরামের এই সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচিতরা কিছু করলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাসহ করণীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব সমকালকে জানান, সংসদে গিয়ে নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। এটা ঐক্যফ্রন্টের সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত। এখনও তারা শপথ নিতে যাননি। তাই এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমে তাদের মতামত দেওয়ার বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে কী করা যায়- তা নিয়ে তারা বৈঠক করেছেন। তবে ঐক্যফ্রন্ট ও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তারা কিছু করবেন না বলে মনে করছেন রব।

সংসদে যাওয়ার বিষয়ে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিজয়ী ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর জানিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুসারী; গণফোরাম কিংবা বিএনপির কেউ নন। জনগণ তাকে ভোট দিয়েছেন, তিনি জনগণের কথা-দাবি তুলে ধরার জন্য, সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখতে চান। অবশ্যই যথাসময়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন, সংসদে যাবেন। ৯০ দিন সময় আছে, এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে বলেও তিনি জানান।

তবে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই দলে তার প্রাথমিক সদস্য হওয়ার আবেদন ও তা অনুমোদনের চিঠি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে গণফোরাম। গত বছরের ১০ নভেম্বর তিনি এ আবেদন করেন এবং ওইদিনই তাকে প্রাথমিক সদস্য পদ দেওয়া হয়।

সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান বলেছেন, নির্বাচনের পর তাদের দলের বর্ধিত ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় নেতারা নীতিগতভাবে সংসদে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনও সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, সংসদে যাওয়ার বিষয়ে তিনি ইতিবাচক। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ড. কামাল হোসেন ও দল যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন, তা তিনি মেনে নেবেন বলে জানান মোকাব্বির।

সূত্র জানিয়েছে, এই দুই নেতা দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দেওয়ায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু জরুরি বৈঠক আহ্বানের জন্য নির্দেশ দেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় শুরুতেই দুই নেতা কার্যালয় ত্যাগ করেন।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, সংসদে যাওয়ার বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেদের মত দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই নেতাকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। দলের সভাপতি দেশের বাইরে থাকায় গতকাল এই শোকজ দেওয়া না হলেও আজকালের মধ্যে তা দেওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজের এক নেতা জানান, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দেশের বাইরে রয়েছেন। তাদের ফিরে আসা পর্যন্তও অপেক্ষায় থাকতে চাইছেন না তারা। ড. কামাল হোসেন জনগণের রাজনীতি করেন। তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এ দুই নেতা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তাই বৈঠকে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে তার আগেই এ দুই নেতা কার্যালয় ত্যাগ করেন।

সূত্র জানিয়েছে, গণফোরামের নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্যের জাতীয় সংসদে যাওয়ার ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন সিনিয়র নেতারা। বেশিরভাগ নেতা যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত দলের হেভিওয়েট নেতারা না যাওয়ার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। দলটির মধ্যম সারির ও তৃণমূল নেতাকর্মীরাও না যাওয়ার পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। নেতাকর্মীদের এমন বিভক্ত অবস্থানে বেকায়দায় রয়েছেন গণফোরামের শীর্ষ নেতারা। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন কিছু নেতা ঐক্যফ্রন্টে বিএনপির সম্পৃক্ততা ও ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার বিষয়ে শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন। এবার সংসদে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে তারা দলত্যাগ করতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

দলটির নেতাকর্মীরা জানান, একদিকে ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত আর অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরে চাপের মুখে সংসদে যাওয়ার বিষয়ে সময়ক্ষেপণ করার কৌশল নিয়েছে গণফোরাম।

মতামত