টেকনাফ হতে কক্সবাজারের পথে( ২য় পর্ব): মুহাম্মদ ইছমাইল বকুল

ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের  উচ্ছিষ্ট পণ্যের কল্যাণে বাজারে বাজারে গড়ে উঠেছে লইন্স্যা মার্কেট, মার খাচ্ছে স্থানীয় মুদি দোকানদার গণ। তাদের দেখার কেউ নেয়, তারা তো অপরাধী, তাদের অপরাধ তারা উখিয়া- টেকনাফের স্থায়ী বাসিন্দা।এ সব ভাবনার মাঝেই উখিয়ায় এসে পৌছাঁলাম।

গাড়ি হতে নেমে অভ্যাসজনিত কারণে চায়ের কাপের অদ্ভুত টানে উখিয়া স্টেশনের এক টি- স্টলে দাঁড়িয়ে চাতে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ একজন চেনা মানুষের সাথে দেখা, লোকটি আমার গ্রাম হতে দক্ষিণে চারটি গ্রামেরে পরের গ্রামের স্থায়ীবাসিন্দা। মোটামোটি অবস্থাসমাপন্ন লোকটির সাথে বহুবছর আগ হতে পরিচয় এবং সখ্যতা। চা খেতে খেতে দু’ জনের মধ্যে কথা হচ্ছিলো জানতে চেয়ে অবগত হলাম এখন তিনি চট্টগ্রামে থাকেন,চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কর্মরত আছেন, বিশেষ প্রয়োজনে গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসে এখন কর্মস্থলে ফিরার পথে, অবাক হলাম তার বর্তমান পরিস্থিতির কথা শুনে,অথচ এ লোকটির একদিন সব ছিলো! 

নিয়মিত নাফ নদীতে জাল  পেলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো,পাঁচ সন্তানের জনক এ লোকটি অত্যন্ত উদারমনা ব্যক্তিত্বের অধিকারী, দু’ টা বড় জালের ( বিঙ্গী জাল) মালিক, সাথে নৌকার ও। জানতো চেয়ে অবগত হলাম, নাফ নদীতে জাল পেলে সংসার চালানোর মতো পরিস্থিতি আজ আর নেই, রোহিঙ্গা আসার পর হতে নদীতে মাছ ধরার মতো অবস্থা সংকোচিত হয়েছে, এ জন্য অবশ্যই রোহিঙ্গা দায়ী নয়, দায়ী কতিপয় অর্থলোভী বাঙালী। নদীতে জাল পেলতে 
 

হলে কতিপয় মেনে চলতে হয় , বিশেষ একশ্রেণীর ( নাম বলতে অক্ষম)স্থানীয় সোর্সকে ম্যানেজ করতে হয়, এ ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম ও সৃজিত হয়েছে,যেটা নাফ নদীতে মাছ ধরা আইন হিসেবে বিবেচিত। স্থানীয় সব জেলেরা  এ নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য,অন্যথায় মাছ ধরা কোনভাবেই সম্ভব না। বিশেষ এ নিয়মের সম্পর্কে জানতে গিয়ে অবাক না হয়ে পারলাম না। একবার নদীতে জাল পেলতে হলে ঐ শ্রেণীর  জন্য ১২০০ টাকা,মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য ১২০০ টাকা,স্থানীয় সোর্সের জন্য ৬০০. মোট তিনহাজার টাকা প্রয়োজন। যদিও একপয়সার মাছ ধরতে না পারলে ও তা পরিশোধ করেই জাল পেলতে হবে। এক্ষেত্রে কোনপ্রকার অজুহাত নেই। কোন প্রকার নদীর জলে পা পেলতেই যেন তিনহাজার টাকা।দিনে  দু’ বার জাল পেলতে হলে ছয় হাজার টাকা লাগবেই।যা স্থানীয় জেলে পাড়ায়  এটা পাশ নামে পরিচিত।   এভাবে লোকসান গুনতে গুনতে আজ পথে বসে নিরুপায় হয়ে সে যান্ত্রিক শহরে জীবিকার টানে চলে যায়।

এ  অত্যচারের ব্যাপারে মুখ খোলাটা ও আরও অনিরাপদ। প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরে থাকার যন্ত্রণা কতই যে নিষ্টুর তা বুঝারমতো পরিস্থিতিতে যারা পড়েনি  তারা কেউ বুঝতে পারবে না,শুধু এটুকু বলা যায় তার চোখ ঘুমালে ও মন কখনো ঘুমায় না,তার মন পড়ে থাকে প্রিয়জনের আহবানে,চেনা নদীর কলতানে!ভাবতেই অবাক হয় একেমন বিচার? এ কেমন সার্বভৌম দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা?  এ কেমন  বাংলাদেশ? এ কেমন মাছধরার নিয়ম -বিধি? ভাবছেন হয়তো শুধু জেলেরা অশান্তিতে আছেন, এ ভাবনা ভুল, পুকুরের পানিতে ঢিল ছুড়লে যেমন পুরো পরিসরে ঢেউ উঠে, তেমনি এ সমাজের একশ্রেণীর মানুষ শোষিত হলে তার প্রভাব সবার উপর পড়ে, যার ফলে টেকনাফের স্থানীয়রা চড়া দামে মাছ কিনতে বাধ্য,সার্মথ্য না থাকিলে নিরামিষ খাওয়াটা নিরাপদ নয় যেহেতু রোহিঙ্গা আসার পর অজাইত্তা কচুর লতির দাম ও শতটাকা অতিক্রম করেছে।

শাক- সবজির দাম নিরাপত্তার চাদরের বাইরে,বাশঁ আর ইটের দাম তো মাশাল্লাহ! সব পণ্য( চাল,ডাল,তেল ছাড়া) ক্রয় ক্ষমতা নিতান্তপক্ষে আয়ের সাথে সমীচিন নয়! এ কেমন টেকনাফ? ভাবতে গিয়ে  চরম হতাশা নিয়ে লোকটিকে বিদায় জানিয়ে সি,এন,জি করে মেরিন ড্রাইভ হয়ে কক্সবাজারের উদ্যেশে রাওয়ানা দিলাম। মেরিন ড্রাইভ রোডের বাকী পথ আগামী পর্বের জন্য রেখে দিলুম!

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। আলোকিত দেশ টুয়েন্টিফোর.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে আলোকিত দেশ টুয়েন্টিফোর.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।] প্রিয় পাঠক আপনি চাইলে আপনার মূলবান মতামত লিখে আমাদের পাঠাতে পারেন। আমাদের ইমেইল: newsalokitodesh@gmail.com । আপনাদের পাশেই আছে আলোকিত দেশ টুয়েন্টিফোর.কম। ধন্যবাদ।

মতামত