গত এক বছরে চৌদ্দগ্রামে হত্যা, আত্মহত্যায় ৩৩ জনের প্রান হানি

আনিছুর রহমান, চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:  বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। সামান্য বাক-বিতন্ডার জের ধরে হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনা থেমে নেই। গত এক বছরে হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ৩৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে। চৌদ্দগ্রাম থানা, নিহতদের স্বজন ও সাপ্তাহিক চৌদ্দগ্রাম পত্রিকা সুত্রে এ তথ্য জানা গেছে। নিহতরা হলেন; ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাকিল নামে ছাত্রলীগের এক নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

নিহত শাকিল গুণবতী ইউনিয়নের গুণবতী গ্রামের বড় বাড়ির হুমায়ন কবিরের পুত্র। সে ফেনী জয়নাল হাজারী কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও ফেনী পৌরসভার ১৭ ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ন আহবায়ক ছিলেন। ৬ মার্চ মোবাইল চুরির অভিযোগে শরিফ হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত শরিফ সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজি এলাকার কালিকাপুর গ্রামের চারু মিয়ার পুত্র ও  কোমাল্লা গ্রামে আবদুল হামিদের মেয়ের জামাই। ১৪ মার্চ বুধবার সকালে সদর দক্ষিণ উপজেলার জোড়কানন সংলগ্ন ভাটপাড়া এলাকার একটি জমি থেকে সাদ্দাম হোসেন নামের এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।

সে শ্রীপুর ইউনিয়নের বালুধুম গ্রামের আবদুল লতিফের পুত্র। ২ এপ্রিল সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইয়াবা বিক্রি নিয়ে দ্বন্দ্বে ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন সাইফুল আলম রাকিব(২৩) নামে এক যুবক। রাকিব কনকাপৈত ইউনিয়নের আগুনশাইল গ্রামের শাহ আলম সওদাগরের পুত্র। ২ এপ্রিল সোমবার রাতে গলায় ওড়না পেছিয়ে ফাতেমা নুর সুমি নামের এক তরুণী আত্মহত্যা করেছে।

সে কাশিনগর ইউনিয়নের জয়মঙ্গলপুর গ্রামের সোলেমান মিয়ার মেয়ে। ১০ এপ্রিল পারিবারিক বিরোধের জের ধরে সেকান্তর আলী নামের এক ব্যক্তি গলায় ফাঁসি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি উজিরপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মরহুম ছমির আলীর পুত্র। ২৮ এপ্রিল শনিবার রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের দক্ষিণ ডিমাতলী মসজিদের সামনে মাদক ব্যবসা ও পাচারের বিরোধীতা করায় বদিউল আলম নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি ইউনিয়নের কেছকিমুড়া উত্তরপাড়ার মরহুম ইসমাইল মিয়ার পুত্র।

৯ মে বুধবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকার অফ বিট রিসোর্ট এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা একটি লাশ উদ্ধার করা হয়। গুণবতী রেল ষ্টেশনে ৮ জুন শুক্রবার অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ১১ জুন সোমবার রাতে বাতিসা ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামের শিপন মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার ও ১২ জনু মঙ্গলবার সকালে শুভপুর ইউনিয়নের কাদৈর গ্রামের রিকশাচালক আবুল কালামের ছেলে আরিফ হোসেন গলায় ফাঁসি লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

১৭ জুন রোববার ভোরে পারিবারিক কলহের জেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন শুক্কুর আলী। তিনি আলকরা ইউনিয়নের দক্ষিন কাইচ্ছুটি গ্রামের মরহুম আব্দুল জলিলের পুত্র। একইদিন মুন্সিরহাট ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের মামুনুর রহমান (২৬) এক যুবকের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সে একই গ্রামের আবু তাহেরের পুত্র। ঢাকায় তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ২২ জুন শুক্রবার দেলোয়ার হোসেন বাদশা(২৫) নামের এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে। সে বাতিসা ইউনিয়নের জামুকরা গ্রামের মোহাম্মদ আলী ছেলে।

২৫ জুন সোমবার রাতে পারিবারিক কলহের জের ধরে বিষপানে আজমীর হোসেন নামে এক ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। তিনি চিওড়া ইউনিয়নের নেতড়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার সৌদি প্রবাসী জসিম উদ্দিনের ছেলে। ২৭ জুন বুধবার সকালে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রীর ওড়না গলায় পেছিয়ে নুর মোহাম্মদ তপি(২৬) নামের এক যুবক আত্মহত্যা করেছে। সে পৌর এলাকার নাটাপাড়া গ্রামের মরহুম লাতু মিয়া প্রকাশ মিয়াধনের ছেলে।

৬ জুলাই শুক্রবার দুপুরে কাশিনগর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে সালমা আক্তার(১৯) নামের এক যুবতী গলায় ওড়না পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে।  নিহত সালমা নুরুজ্জামান মিয়ার মেয়ে। ৩০ জুলাই সোমবার দুপুরে মোবাইল কিনে না দেয়ায় পিতা-মাতার সাথে অভিমান করে তৌহিদুল ইসলাম নামের এক কিশোর গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সে বাতিসা ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী কালিকাপুর গ্রামের মোঃ নিপুর ছেলে।

৮ আগস্ট বুধবার সন্ধ্যায় আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরায় রাজমিস্ত্রীর শ্রমিক সাইদুল হক রিপন(২৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে দূর্বৃত্তরা। তিনি আলকরা ইউনিয়নের আলকরা গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার সামছুল হকের ছেলে। ৮ আগস্ট বুধবার নিখোঁজের তিন দিন পর আবদুল মুনাফ(৫৫) নামের এক ব্যক্তির লাশ নাঙ্গলকোটের একটি বিল থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি চিওড়া ইউনিয়নের নেতড়া গ্রামের মরহুম আবদুল হালিমের ছেলে।

১৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির সাথে অভিমান করে মোঃ মামুন নামের এক যুবক গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি উজিরপুর ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণনগর গ্রামের সাদেক মিয়ার পুত্র। ঘোলপাশা ইউনিয়নের তুলাপুস্করণী গ্রামের গৃহবধু রিমা আক্তার আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় ১৯ আগস্ট রোববার তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে-গৃহবধু আঁখিকে হত্যা শেষে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে স্বামীর পরিবার। ৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে পিতা-মাতার সাথে অভিমান করে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে আরিফুল ইসলাম(১৬) নামের এক যুবক। সে শুভপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে। ১০ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় প্রেমিকার সাথে অভিমান করে ফেসবুকে আগাম জানিয়ে আত্মহত্যা করেছে সৈকত হোসেন(১৯) নামের এক যুবক। সৈকত বাতিসা ইউনিয়নের আটগ্রামের মাহবুবুল হক ওরফে চৌধুরীর ছেলে।

২৪ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে বিচারের রায় না মেনে শালিস বৈঠক ত্যাগ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আবদুল আউয়ালকে কুপিয়ে ও চুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। সে উজিরপুর ইউনিয়নের আশ্রাফপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নানের ছেলে। ২৬ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে নারায়নপুর গ্রামে ভাড়া বাসায় বিষপানে আছমা বেগম(৩০) নামের দুই সন্তানের জননী আত্মহত্যা করেছে। তিনি নোয়াখালীর সুধারাম থানার পূর্ব শোলাপিয়া এলাকার মহিন উদ্দিনের স্ত্রী। ৮ অক্টোবর সোমবার আলকরা ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিনের প্রাণনাশের আশঙ্কা মামলার স্বাক্ষী ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন শাকিলকে রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শাকিল কুলাসার গ্রামের ছালেহ আহাম্মদ প্রকাশ বধু মিয়ার পুত্র ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

৯ অক্টোবর মঙ্গলবার পারিবারিক বিরোধের জের ধরে অভিমানে গলায় ফাঁসি লাগিয়ে দুই ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে। তারা হলেন; শুভপুর ইউনিয়নের কটপাড়া গ্রামের ইয়াসিন মিয়ার পুত্র মানসিক রোগী আবদুর রশিদ(৫৫) ও শ্রীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপুস্করণী গ্রামের আলমগীর হোসেনের পুত্র জাহিদুল ইসলাম(১৮)। ২৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে যৌতুকের দাবিকৃত টাকা না দেয়ায় পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। নিহত অন্তঃস্বত্তা নারী চিওড়া ইউনিয়নের সারপটি গ্রামের কামরুল ইসলামের স্ত্রী রোকেয়া বেগম। ৩ নভেম্বর শনিবার ভোরে জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের ষাটিশক গ্রামের নুরুল আলমের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন রাজন কর্তৃক তার স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৪ নভেম্বর রোববার সকালে উজিরপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে নেশাগ্রস্ত পুত্রের হাতে আবদুস সাত্তার প্রকাশ মাইনু মিয়া(৬২) খুন হয়েছে। ২১ নভেম্বর বুধবার বিকেলে চৌদ্দগ্রাম সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক মাহমুদা আক্তার শিরিনের বাসায় আকলিমা আক্তার(১৪) নামের এক গৃহকর্মী গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

নিহত আকলিমা নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার পশ্চিম বিল কাকরাকান্দা গ্রামের জাহের আলীর মেয়ে। ৮ ডিসেম্বর শনিবার রাতে  শুভপুর ইউনিয়নের ধনিজকরা গ্রামে ঘুমের মধ্যে এক সন্তানের জননীকে হত্যার পর পালিয়েছে পাষন্ড স্বামী। নিহতের নাম আয়েশা আক্তার(২৫)। তিনি চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার বীরচন্দ্রনগর গ্রামের শাহ আলমের ছেলে শাকিল মিয়ার স্ত্রী।

মতামত