স্মৃতিচিহ্ন: কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের প্রতি এত অবহেলা!


খুলনা প্রতিনিধি •


‘যে জন দিবসে মনের হরষে, জ্বালায় মোমের বাতি, আশুগৃহে তার দেখিবে না আর, নিশীথে প্রদীপ ভাতি’ কিংবা ‘চির সুখীজন ভ্রমে কি কখন, ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে; কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’- শৈশবে কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের এ দুটি কবিতা পড়েননি এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটীতে সেই কবির জন্মস্থানের স্মৃতিচিহ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এ ছাড়া কবির পুকুরসহ এক একরেরও বেশি জমি চলে গেছে অবৈধ দখলে।ভৈরব নদের তীরে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটীতে নীতিকবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৪ সালের ১০ জুন। ১৮৬১ সালে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সদ্ভাব শতক’ প্রকাশ হয়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। কবিতা লেখার পাশাপাশি শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করেছেন কৃষ্ণচন্দ্র। ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। শিক্ষকতা করেছেন ১৯ বছর। ১৯০৭ সালের ১৩ জানুয়ারি পরপারে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই অমর কবি।

সরেজমিন দেখা গেছে, কবির জন্মস্থান সেনহাটী গ্রামের শিববাড়ি এলাকায় এখন শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ, নামফলক, কংক্রিটের বেঞ্চ ও একটি ছোট্ট কামিনী গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। সেখানে আবার অবৈধভাবে ইট-বালু রেখে ব্যবসা করছেন দু-তিনজন। কৃষ্ণচন্দ্রের পুকুরসহ এক একরেরও বেশি জমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। কবির বাড়িতে যে মন্দিরটি ছিল, সেটির অবস্থাও জরাজীর্ণ।

কবির মৃত্যুর সাত বছর পর তার বাড়ির সামান্য দূরে ১৯১৪ সালে ৩৩ শতক জমির একাংশে গড়ে তোলা হয় ‘কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউট’। বাকি জায়গা খালি পড়ে আছে, সেখানে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। ইনস্টিটিউটের অবস্থাও জরাজীর্ণ, ছাদের ওপর জন্মেছে বট-পাকুড়ের গাছ। ইনস্টিটিউটের ভেতর ১০-১২টি বই, একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার ও দেয়ালে কয়েকটি ছবি ছাড়া তেমন কিছুই নেই। কবির লেখা গ্রন্থগুলোও এখানে নেই।

কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুল ইসলাম বলেন, কবির বসতভিটা ও পুকুর অনেক আগেই অবৈধ দখলে চলে গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে কয়েকবার অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। কবি জীবদ্দশায় যে পুকুরে গোসল করতেন, সেটি এখন খাদির মার পুকুর নামে পরিচিত। এটা কখনও আমরা প্রত্যাশা করিনি। তিনি বলেন, কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউটে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দুই বছর আগে কিছু টাকা দেয়, যা দিয়ে মেঝে টাইলস করা হয়। এর বাইরে আর কোনো সংস্কার বা উন্নয়ন হয়নি।

ইনস্টিটিউটের সভাপতি মো. আকতার হোসেন বাবলু হতাশার সুরে বলেন, সেনহাটীতে কবির স্মৃতিচিহ্ন বলতে এখন শুধু স্মৃতিস্তম্ভ এবং একটি ইনস্টিটিউট আছে। তার বংশধররাও কেউ এখন আর এখানে থাকেন না। প্রশাসনের উচিত এখন কবির যে স্মৃতিচিহ্নগুলো অবশিষ্ট আছে তা যেন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কবি কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে গবেষণা করছেন সেনহাটী এলাকার আলহাজ সারোয়ার খান ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে কৃষ্ণচন্দ্রের বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা ছিল। তার লেখা কবিতা দিয়ে ভাব সম্প্রসারণ পড়ানো হতো। কিন্তু এখন আর তা নেই।

ইনস্টিটিউটের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোল্লা মাকসুদুল ইসলাম বলেন, কবি কৃষ্ণচন্দ্র আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছেন। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী এবং তার লেখা বিখ্যাত কবিতাগুলো স্থান দেওয়া প্রয়োজন।

ইনস্টিটিউটের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আবদুল হাই কবির জন্মস্থানকে ঘিরে একটি মিউজিয়াম ও বহুমুখী কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি জানান। তিনি বলেন, যশোরের কেশবপুরে কবি মাইকেল মধুসূদন, খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি এবং রূপসার পিঠাভোগ গ্রামে কবিগুরুর পিতৃপুরুষের ভিটায় রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়েছে। সে রকমভাবে এখানেও কবি কৃষ্ণচন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, কবির জন্মস্থানটিকে গত ১০ মে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়েছে। শিগগির সেখানে নোটিশ বোর্ড এবং পরিচিতি ফলক স্থাপন করা হবে, যাতে কবির সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম, এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীরা জানতে পারেন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কবির স্মৃতিগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মতামত