নরসিংদীতে ড্রাগন চাষে বিপ্লব, জেলার সর্বত্রই বানিজ্যিক ভাবে চাষ হচ্ছে এ ফল

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী • ‘ছোট বেলা থেকেই ব্যতিক্রম কিছু করার শখ ছিল । কলেজে পড়ালেখা কালীন সময় থেকেই চিন্তা নতুন কিছু করতে হবে। যা দেখে অন্য মানুষ অনুপ্রাণিত হবে।’ এভাবেই নিজের স্বপ্নের কথাগুলো বলছিলেন নরসিংদী শিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা। ইতোমধ্যে নরসিংদীতে মাল্টা চাষ করে ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। এবার ড্রাগন চাষে তার সেই সুখ্যাতির স্বাক্ষর রাখতে চান। আরিফুল ইসলাম মৃধা নয় তার মত অনেকেই এখন নরসিংদীতে বানিজ্যিক ভাবে ড্রাগন চাষ শুরু করেছে। এ ফল চাষ লাভজনক বিধায় বর্তমানে নরসিংদীতে ড্রাগন চাষে বিপ্লব ঘটেছে।

ড্রাগন নামটা শুনলেই শরীরে কেমন জানি শিহরন উঠে। হিং¯্রতার গন্ধ মিলে। কিন্তু ড়্রাগন বিদেশী সুস্বাধু ফল। থাইল্যান্ডের ড্রাগন ফল এখন বিশ্বখ্যাত। অতিথি আপ্যায়নে পুষ্টিগুণে ভরা ওষুধি ড্রাগন ফলের খ্যাতি আছে। সেই ড্রাগন ফল মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সুখ্যাতি অর্জনের পর বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কিন্ত তা শহর কেন্দ্রিক।

এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এখনও এর পরিচিতি না থাকায় তেমন চাহিদা ক্ষেত্র গড়ে উঠেনি। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এদেশে ফলটির পরিচিতি আসবে। অন্যদিকে সারা দেশে ড্রাগন চাষ ও বাজারজাতে করে যুব সমাজ বেকারত্ব গোছাতে পারবে কারণ ইতিমধ্যে বিদেশী জাতের ড্রাগন ফলের চাষাবাদে সাফল্য দেখিয়েছে কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের আওতাধীন নরসিংদীর শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। বিশেষ করে নরসিংদীর মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করছেন এখানকার গবেষকরা। তাদের হাত ধরেই নরসিংদীতে ড্রাগন ফল চাষে সফলতা সফলতা পাচ্ছে স্থানীয় চাষীরা । ফসলি জমি কিংবা বাড়ির ছাদের টবেও ড্রাগন ফলের গাছ লাগানো যায়।

গবেষণাকেন্দ্রের সূত্র মতে, ড্রাগন ফল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণম-লীয় এলাকার ফল। এটি ক্যাকটাস জাতীয় ফলের অন্তর্ভুক্ত। ড্রাগন ফলের গাছ লতানো ইউফোরবিয়া গোত্রের ক্যাকটাসের মতো। লতাবিশিষ্ট গাছটিতে ক্যাকটাসের মতো পাতাতেই প্রথমে সুদৃশ্য ফুল ও পরে ফলের জন্ম হয়। গাছটি দেখলে একে সবুজ ক্যাকটাস বলেই মনে হয়। এর উৎপত্তিস্থল মধ্য আমেরিকা। চীনের লোকেরা একে ফায়ার ড্রাগন ফ্রুট এবং ড্রাগন পার্ল ফ্রুট বলে। এ ছাড়া ফলটি ভিয়েতনামে সুইট ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফ্রুট ও থাইল্যান্ডে ড্রাগন ক্রিস্টাল নামে পরিচিত। ভিয়েতনামে ড্রাগন ফল বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকহারে চাষাবাদ করা হয়।

ড্রাগন ফল লাল ও হলুদ রঙের হয়ে থাকে। প্রচলিত ফলের চেয়ে ড্রাগন ফলের স্বাদও ভিন্ন। এই ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি। ডিম্বাকৃতি ও গোলাকার ড্রাগন ফলের শাঁস খেতে হয়। এর শাঁস খুবই সুস্বাদু। এ ছাড়া এটা সালাদ, কেক ও আইসক্রিমে ব্যবহৃত হয়। ফলটি উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন বিশেষ করে ভিটামিন-সি, আঁশ ও এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। যা হজমশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও চোখের জ্যোতি বাড়ায়। রক্তের গ্লুকোজ ও হাইপারটেনশন, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমায়।

২০১৩ সালে কুমিল্লা আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র থেকে আটটি ড্রাগন ফলের কাটিং সংগ্রহ করে নরসিংদীর শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ দুই বছর পরিচর্যার পর সফলতা পান গবেষকরা।

কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরিফুল হক বলেন, ‘ড্রাগন গাছের বয়স তিন থেকে চার বছর হলে গাছে ফল আসা শুরু হয়। এ গাছের ফুল ফোটে রাতে। দেখতে অনেকটা নাইট কুইন ফুলের মতো, লম্বাটে, সাদা ও হলুদ। ড্রাগন ফুলকে রাতের রানি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ফুল স্বপরাগায়িত। তবে মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড়ের পরাগায়ণ ত্বরান্বিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়ণও করা যেতে পারে। সাধারণত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয় এবং অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি পিলারের পাশে দুই থেকে তিনটি চারা বা কাটিং লাগানো হলে প্রতি কাটিং থেকে ১২ থেকে ১৪টি ফল পাওয়া যায়। আকারভেদে ফলের ওজন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

প্রথমবারের মতো সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে শিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তুলছেন ড্রাগন ফলের বাগান। উপজেলার চক্রধা ইউনিয়নের পূবেরগাঁও গ্রামে গড়ে তোলা এ বাগানে ড্রাগন চারার সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে রোপন করা এই বাগানে এরই মধ্যে প্রায় প্রতিটি গাছে ফুল এসেছে এবং ইতোমধ্যে গাছে শোবা পাচ্ছে ড্রাগন ফুল। প্রথম বছরই আশানুরপ ফল পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী সৌখিন কৃষক উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা।

সরেজমিনে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আরিফুল ইসরাম মৃধার ড্রাগন বাগানে গিয়ে দেখা যায় প্রতিটি ড্রাগনফল গাছেই ড্রাগন ফুল ও ফল শোভা পাচ্ছে। এসময় কথা হয়ে বাগান মালিক আরিফুল ইসলাম মৃধার সাথে। প্রতি বিঘা জমিতে পাঁচশ এর অধিক চারা হিসেবে সাড়ে ৩ হাজার ড্রাগন ফলের চারা রোপণ করছেন আরিফ মৃধা। উন্নত ফল উদ্ভাবনে জাতীয় পুষ্টি প্রকল্প, খামারবাড়ি ঢাকার আওতায় এবং নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার থেকে ড্রাগন ফলের তিন হাজারেরও বেশি চারা সংগ্রহ করেন তিনি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব চারা দিয়ে সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলেন ড্রাগন বাগান।

সাদা ও লালসহ মোট তিন ধরণের ড্রাগন ফলের চারা রোপন করা হয়েছে বাগানটিতে। শ্রমিকের মজুরি, গোবর সার প্রয়োগ, ড্রাগন চারা বেড়ে উঠার জন্য সিমেন্টের খুঁটি, সাইকেলের পরিত্যক্ত টায়ার, বাগানে তারের বেড়া ও ফুল পরাগায়নের জন্য বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা করতে গিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন বাগানে। এর অর্ধেক টাকা ব্যয় হয়েছে শ্রমিকের মজুরি হিসেবে।
তিনি জানান, বছরের ৭ থেকে ৮ মাসই ড্রাগনের ফলন পাওয়া যায়। প্রতিটি ফল যদি ওজনে ৫ শত গ্রামের ওপরে হয় তাহলে ৫ শত টাকা কেজি ধরে বাগানেই এই ফল বিক্রি করা যায়। ৫ শত গ্রামের নিচে হলে তিন থেকে চারশত টাকায় বিক্রি করা যায়।

চলতি ১ জুন প্রথম দফায় ২ লাখ টাকার ড়্রাগন ফল বিক্রি করা হয়। এবছর বাগান তৈরির খরচ তুলে নিয়ে যত সামান্য লাভ করতে পারলেও পরবর্তী বছর গুলোতে বাগান তৈরির ঝামেলা না থাকায় শ্রমিক খরচ বাধে পুরোটাই লাভের খাতায় থাকবে বলে তিনি মনে করেন। বছরের বেশিরভাগ সময়ই ফল পাওয়া যায় বিধায় ড্রাগন চাষে সফলতা অর্জন সম্ভব বলে তার ধারণা।

ব্যস্ত এই জনপ্রতিনিধি বিনিয়োগ বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যুবকরা লেখাপড়ার পর চাকরি না পেলে বসে বসে বেকার সময় পার করেন। কৃষিকাজে অনিহা করেন। ড্রাগন চাষ সৌখিন কৃষি কাজ ও লাভজনক নিঃসন্দেহে। আমার বাগান দেখে কোনও বেকার যুবক যদি ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয় তাহলে আমার বাগান করা স্বার্থক হবে বলে মনে করি।

নরসিংদী সদর উপজেলার শীলমান্দি গ্রামের ড্রাগন ফল চাষি সালাম জানান, ৫ শতাংশ জমিতে ১০০টির বেশি ড্রাগন গাছ লাগিয়ে ছিলেন। প্রত্যেকটি গাছই এখন ফুলে ফলে ভরা। গত বছর তিনি ৪৫০ টাকা দরে ফল বিক্রি করেছেন। অনান্য ফসলের পাশাপাশি ড্রাগন চাষ অধিক লাভজনক বলে জানান তিনি।

রায়পুরার চর মরজালের সৌখিন ড্রাগন ফল চাষি রহিম বলেন, ‘প্রথমে ঢাকার একটি ফলের দোকান থেকে ড্রাগন ফল কিনে খাওয়ার পর থেকে নার্সারী থেকে গাছ সংগ্রহ করে বাড়ির ছাদে লাগাই। এ বছরও বেশ কিছু ফল ধরেছে।’
‘বাড়ির ছাদে টবে বা ড্রামের মধ্যে জৈব সারের মাটি ফেলে তাতে ড্রাগন চারা পুতে দিলেই হয়। ড্রাগন গাছ তিন ফুট উঁচু হলেই একটি শক্ত চিকন খুঁটির সঙ্গে সাইকেলের পুরাতন টায়ার ঝুঁলিয়ে দিলেই তাতে ডালপালা বিস্তার করে লতানো গাছটি। কয়েক মাস পরে ফুল ফোটে এবং ফল আসে। ড্রাগন ফল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী।’

শুধু আরিফুল ইসলাম মৃধা, সালাম কিংবা রহিম নয় জেলার অনেক যুবকই জেলার বিভিন্ন এলাকায় বানিজ্যিক ভাবে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন।
বানিজ্যিক ভাবে ড্রাগন বাগান গড়ে তোলা নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালী এলাকার আব্দুল মোমেন। তিনি শিবপুর উপজেলার জয়নগরে ২ বিঘা জমিতে প্রাথমিক ভাবে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন। পর্যায় ক্রমে এর প্রসাঢ় কবেন বলে তিনি সমকালকে জানান।

নরসিংদীর মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন ফল চাষে উপযোগী জানিয়ে শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: মশিউর রহমান বলেন, ‘ড্রাগন ফল আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন একটা ফল। এই ফল দেশে আমদানি হওয়ার পর আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিক্তিক আমাদের গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা করে দেখেছি এটা কোন কোন জায়গায় উপযোগী। এরই অংশ হিসেবে আমরা ড্রাগন ফল শিবপুরে পরীক্ষামূলক চাষ করে সফলতা পেয়েছি। যা এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে আমরা ড্রাগন ফল চাষের কলাকৌশল কৃষককে জানিয়ে চারা বিতরণ শুরু করেছি।’

মশিউর রহমান আরো বলেন, ‘আশা করছি, অচিরেই ড্রাগন ফলটি এ জেলার অর্থকরী ফল হিসেবে বিবেচিত হবে।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক লতাফত হোসেন জানান, এ বিদেশি জাতের ড্রাগন ফলের চাষাবাদে চাষীদের সাফল্য দেখিয়েছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতাধীন নরসিংদীর শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র।

নরসিংদীর মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করছেন এখানকার গবেষকরা। তাই যুব উন্নয়নের আর্থিক সহায়তা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক ড্রাগন চাষে আগ্রহী চাষীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের মাধ্যে প্রায় বেশ কিছু ড্রাগন ফলের চারা বিতরণ করা হয়েছে।

মতামত