তবু জেগে থাকে হেমন্ত

 

এবার হেমন্তও বৃষ্টিমুখর। বর্ষা-শরতে বর্ষণ হলো যথেষ্ট। তার রেশ কাটাতে পারছে না হেমন্ত। এই তো টানা তিন দিন ধরে বৃষ্টি হলো গত সপ্তাহেও। ছিটেফোঁটা ঝরছে মাঝে মাঝেই। কালো মেঘ জমছে আকাশে। কোনো কোনো দিনে পুরো মেঘমেদুর পরিবেশ। তাই এই হেমন্তকে তার স্বরূপে পাওয়া যাচ্ছে না এখনো।

 

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যের অবস্থানগত কারণেই হেমন্ত খানিকটা প্রচ্ছন্ন। শরৎকাল বর্ষারই প্রলম্বিত পর্যায়। শরতের শেষ ভাগে এসে বৃষ্টিবাদল কমতে থাকে। পেঁজা পেঁজা মেঘ ভেসে বেড়ানো ঝলমলে আকাশের গায়ে এসে লাগে কুয়াশার মলিন স্পর্শ। হেমন্তের শুরুটা সেখান থেকেই। তবে শহরাঞ্চলে হেমন্তের প্রকৃতি আপন বৈশিষ্ট্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। দিনগুলো একটু একটু করে কীভাবে যেন ছোট হয়ে আসে। বেলা পড়ে এলেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে দ্রুত। রোদও হারিয়ে ফেলতে থাকে তার তেজ। এসব দেখেই শহুরে লোকের অনুভবে আসে—বদলে যাচ্ছে ঋতু। শীত আসছে। হেমন্ত কিন্তু ঊহ্যই থেকে যায়, মনে পড়ে শীতের কথা।

বড় বড় দালানকোঠা এ শহরে রোদ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। মাটিতে ছায়া পড়ে না। হেমন্তের হেলে পড়া সূর্যের কোমল আলোর বিকেলে গাছগাছালির লম্বা ছায়া পড়ে মাটিতে। কখনো বাতাসে ডালপালা কেঁপে গেলে সেই ছায়াও নড়ে ওঠে। মায়াবী আলোয় নিজের ছায়া হয়তো মিশে যায় নিসর্গের ছায়ার সঙ্গে। এ রকম মুহূর্তে অন্তরের গভীরতম কোথাও কোনোখানে এক অনির্বচনীয় অনুভব জেগে ওঠে। চারপাশের সবকিছুই তখন মনে হয় অনিন্দ্যসুন্দর। ভালো লাগায় ভরে ওঠে মন।

নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে এখন অন্য ছবি। তুলোর মতো সাদা হয়ে থাকা কাশবন এখন ধূসর। তুলোর আঁশের শুভ্রমতো মিহি কেশরগুলো ঝরে যাচ্ছে। শুকিয়ে আসছে পাতা। সবারই জানা, এই ধূসরতায় মুগ্ধ ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। লিখেছিলেন হেমন্তের নরম উৎসবের কথা। ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,…।’ তিনি ছাড়া কবিকুলে আর কারও কাছে এমন বদান্যতা জোটেনি হেমন্তের। কাব্যে সাহিত্যেও তাই প্রচ্ছন্নই থেকে গেছে সে।

শিল্পের খ্যাতি না থাক, বৃষ্টি-বন্যার লম্বা বর্ষার পরে আসে অগ্রহায়ণের সমৃদ্ধি। মাঠভরা পাকা ফসল। কৃষকের ঘরে ঘরে কাটা-মাড়াই নিয়ে দুঃসময় পেরিয়ে আসার কর্মচাঞ্চল্য। প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে রাখার চিরকালের গল্প লেখা হয়ে যায় জনজীবনের পাতায় পাতায়।

হেমন্তের মাঝনাগাদ শিশির পড়াও শুরু। দুর্বার ডগায় আটকে থাকা শিশিরবিন্দুতে ঝিকিমিকি করে ভোরের কিরণ। মেঠোপথে হাঁটতে গেলে পা ভিজে যায়। এ রকম কোনো পথ ধরে হেঁটে যাওয়ার স্মৃতি, শিশিরভেজা শিউলি কুড়োনো ভোর—আজীবন সযতনে বুকে আগলে রাখে অনেকে।

হেমন্তে মহানগরের পাড়া-মহল্লা, গলির মোড়ে, ফুটপাতে নতুন চালের গুঁড়ি নিয়ে পিঠা তৈরি করতে বসে গ্রাম থেকে আসা অল্প পুঁজির ফেরিওয়ালার দল। কুয়াশার স্তর পুরু হতে হতে দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে চেপে বসে গায়ে গায়ে লাগানো বহুতল ভবনগুলোর ওপর। আর এ রকম দিনেই শহুরে ফ্ল্যাট বাড়ির গজ-ফুটে মাপা ঝুল বারান্দার টবে লাগানো গাঁদার কলিগুলো ফুটে ওঠে একটি-দুটো করে। লাবণ্যের স্পর্শ পায় ছকে বাঁধা ব্যস্ত নাগরিকের ক্লান্ত দৃষ্টি।

সুত্রঃ প্রথম আলো

মতামত